বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল–৪ (পূর্বাঞ্চল) কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য ও দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী হারুন ইসলাম ওরফে হারুনুর রশিদ। সেবা নিতে আসা গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন যানবাহন সংক্রান্ত সেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের একটি অঘোষিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরাসরি সরকারি নিয়মে সেবা নিতে গেলে নানা অজুহাতে আবেদনকারীদের হয়রানি করা হয়। কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি, কখনো সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা না থাকা কিংবা নতুন কোনো শর্তের কথা বলে তাদের একাধিকবার অফিসে আসতে বলা হয়। অথচ একই কাজ দালালের মাধ্যমে করাতে গেলে তুলনামূলক কম সময়ে তা সম্পন্ন হয়ে যায়। ফলে অনেক গ্রাহক বাধ্য হয়ে দালালের দ্বারস্থ হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, অফিসের গেট ও আশপাশে অবস্থানকারী কয়েকজন দালাল সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেন। জীকু, জাহাঙ্গীর, মনির, শাহাদাত ও সুলতানসহ কয়েকজনের নামও এ ক্ষেত্রে উঠে এসেছে। স্থানীয়ভাবে তাদের ‘গেটিস’ নামে পরিচিত বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ অফিসের ভেতরের সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পুরো প্রক্রিয়ায় হারুন ইসলামের প্রভাব রয়েছে। এমনকি ঢাকা মেট্রো সার্কেল–৪-এ দায়িত্বপ্রাপ্ত মোটরযান পরিদর্শক অসীম পালের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবেও হারুন কাজ করেন—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকটি সূত্র। তবে এ দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
হারুন ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পদ ও জীবনযাপন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার পরও তিনি রাজধানীর মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ৪২৯/এ নম্বর ভবনে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট তার বা পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে। তবে সম্পত্তির মালিকানা ও ক্রয়ের অর্থের উৎস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিলপত্র এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, হারুন ইসলামের জীবনযাপন তার পদ ও চাকরির আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সিলেটে কর্মরত থাকার সময়ও তার নিয়মিত বিমানে যাতায়াত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।
পুরোনো কর্মস্থলেও অভিযোগ
হারুন ইসলাম এর আগে মিরপুর–১৩ নম্বর বিআরটিএ কার্যালয়ের ১১৪ নম্বর কক্ষে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে। ওই সময়ও তাকে ঘিরে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তাকে সিলেট মেট্রো সার্কেলে বদলি করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
তবে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। তার এই বদলির পেছনে অর্থ লেনদেন হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালাল ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন
সেবা নিতে আসা কয়েকজন গ্রাহক অভিযোগ করেন, তারা সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজ করাতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়েছেন। কিন্তু দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। তাদের দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দালালনির্ভর করে তুলছে।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যদি মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ আরও বাড়ে। তাই দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে হারুন ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করে কল কেটে দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বিআরটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, হারুন ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি তার আয়-ব্যয়, সম্পদের উৎস এবং দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে বিআরটিএ কার্যালয়ে দালালনির্ভরতা ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জন্য স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।




















