১২:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

৪০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার চার বছর ধরে অচল, বাগেরহাট পৌরবাসীর পানির হাহাকার

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৩:২৫:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১০

পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট দূর করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে নিয়মিত পৌর এলাকায় সরবরাহের কথা থাকলেও চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে পানির সংকটে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন বাগেরহাট পৌরবাসী।

৪০ কোটি টাকার প্রকল্প, কয়েক মাসেই বন্ধ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়।

প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচাঁদীঘিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সেই পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়।

২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও আর সচল করা হয়নি।

নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ধরেছে মরিচা।

এ ছাড়া রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ বেশ কিছু মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

পাঁচ-ছয় দিন পরপর পানি, তাও অল্প সময়

প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌর এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পরপর পানি আসে। তাও সরবরাহ থাকে অল্প সময়ের জন্য।

পানি আসার সময় কলসি, বালতি ও ড্রাম নিয়ে আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে না পারলে রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা।

পাম্প অপারেটর মতিয়ার রহমান মল্লিক বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে পৌরবাসী নিয়মিত নিরাপদ পানি পেতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

ক্ষোভ পৌরবাসীর

পৌর এলাকার বাসিন্দা কবির শেখ বলেন, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নির্মাণ করা হলেও তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বছরের পর বছর পানির সংকট নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। কখন পানি আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পাঁচ-ছয় দিন পর পানি এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, পানি না থাকায় রান্না, গোসল ও শিশুদের প্রয়োজনীয় কাজ করতেও সমস্যা হয়। অনেক সময় দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। পৌর এলাকায় বসবাস করেও সুপেয় পানির জন্য এভাবে কষ্ট করতে হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে নিয়মিত পানি সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুন্না শেখ বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো না। এখন একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করা প্রয়োজন।

তদন্তের দাবি

বাগেরহাট সুজনের সভাপতি এস কে হাসিব বলেন, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কেন এত বড় একটি প্রকল্প চালু রাখা গেল না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও মানুষ কেন সেবা পাচ্ছেন না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ আবু সাঈদ শুনু বলেন, এটি শুধু পানির সংকটের বিষয় নয়; সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন। জনগণের অর্থে নির্মিত একটি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা দরকার।

দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের: ডিপিএইচই

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।

বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন বলেন, পানি সংকট নিরসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি পুনরায় চালু এবং পৌরবাসীর জন্য নিয়মিত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প দ্রুত সচল হলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পানির সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করছেন বাগেরহাট পৌরবাসী।

সর্বাধিক পঠিত

পাঁচ বছর সঙ্গে থাকলে জীবন বদলে যাবে’—গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে গাড়িচালকের বিস্ফোরক অভিযোগ

৪০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার চার বছর ধরে অচল, বাগেরহাট পৌরবাসীর পানির হাহাকার

আপডেট: ০৩:২৫:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

পৌরবাসীর সুপেয় পানির সংকট দূর করতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল আধুনিক সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। ভৈরব নদীর পানি পরিশোধন করে নিয়মিত পৌর এলাকায় সরবরাহের কথা থাকলেও চালুর কয়েক মাসের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পটি। এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের মূল্যবান যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে পানির সংকটে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন বাগেরহাট পৌরবাসী।

৪০ কোটি টাকার প্রকল্প, কয়েক মাসেই বন্ধ

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাগেরহাট পৌরসভার পানি সরবরাহ প্রকল্পটি নির্মাণ করা হয়।

প্রকল্পের আওতায় ভৈরব নদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি এনে পচাঁদীঘিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পরে আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে সেই পানি পরিশোধন করে ওভারহেড ট্যাংকের মাধ্যমে পৌর এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়।

২০২১ সালের জুনে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর কয়েক মাস পরীক্ষামূলকভাবে পানি সরবরাহ করা হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হলেও আর সচল করা হয়নি।

নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল ওভারহেড ট্যাংক, পাম্প হাউস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হতে বসেছে। বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ধরেছে মরিচা।

এ ছাড়া রিজার্ভারের ঢাকনা, মোটর, ফ্যানসহ বেশ কিছু মূল্যবান সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

পাঁচ-ছয় দিন পরপর পানি, তাও অল্প সময়

প্রকল্পটি বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পৌর এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় দিন পরপর পানি আসে। তাও সরবরাহ থাকে অল্প সময়ের জন্য।

পানি আসার সময় কলসি, বালতি ও ড্রাম নিয়ে আগে থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে না পারলে রান্না, গোসল ও কাপড় ধোয়ার মতো দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা।

পাম্প অপারেটর মতিয়ার রহমান মল্লিক বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে পৌরবাসী নিয়মিত নিরাপদ পানি পেতেন। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতিরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

ক্ষোভ পৌরবাসীর

পৌর এলাকার বাসিন্দা কবির শেখ বলেন, প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নির্মাণ করা হলেও তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বছরের পর বছর পানির সংকট নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। কখন পানি আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পাঁচ-ছয় দিন পর পানি এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, পানি না থাকায় রান্না, গোসল ও শিশুদের প্রয়োজনীয় কাজ করতেও সমস্যা হয়। অনেক সময় দূর থেকে পানি সংগ্রহ করে আনতে হয়। পৌর এলাকায় বসবাস করেও সুপেয় পানির জন্য এভাবে কষ্ট করতে হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে নিয়মিত পানি সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মুন্না শেখ বলেন, প্রকল্পটি চালু থাকলে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো না। এখন একদিকে পানির সংকট, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করা প্রয়োজন।

তদন্তের দাবি

বাগেরহাট সুজনের সভাপতি এস কে হাসিব বলেন, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, কেন এত বড় একটি প্রকল্প চালু রাখা গেল না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও মানুষ কেন সেবা পাচ্ছেন না—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি শেখ আবু সাঈদ শুনু বলেন, এটি শুধু পানির সংকটের বিষয় নয়; সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন। জনগণের অর্থে নির্মিত একটি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত প্রকল্পটি চালু করে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা দরকার।

দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের: ডিপিএইচই

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, ঠিকাদার নির্মাণকাজ শেষ করার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পটি বাগেরহাট পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের।

বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন বলেন, পানি সংকট নিরসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পটি পুনরায় চালু এবং পৌরবাসীর জন্য নিয়মিত সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প দ্রুত সচল হলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পানির সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা করছেন বাগেরহাট পৌরবাসী।