০৫:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল, প্রাণ গেল ১১ বাংলাদেশির

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৮:২১:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৮

:অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। খাবার ও পানির সংকট এবং নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে অন্তত ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১৮ বাংলাদেশিকে। তাদের মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। নৌকাটিতে থাকা ৩৮ জনই বাংলাদেশি ছিলেন।

যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পর নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা চালিয়ে যেতে বাধ্য হন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে। খাবার ও পানির সংকটে একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল হেকিমের ছেলে আবদুল করিম জানান, ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর তাদের উদ্ধারে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি। খাবার ও পানি না থাকায় তাদের চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা যান। পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা। এভাবে টানা প্রায় নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। পরে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

আবদুল করিম বলেন, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও পচন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং চিকিৎসকরা তাদের প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসা দিচ্ছেন। দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এদিকে আবদুল করিমের সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার বিষয়টি তার পরিবার জানত না। তার মা আকলিমা বেগম জানান, ছেলে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার বিষয়ে পরিবারকে কিছু বলেনি।

আবদুল করিমের মামা ও পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুর রাজ্জাকও জানান, ভাগনে সৌদি আরবে থাকতেন। সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টি তারা আগে জানতেন না।

মিসরে উদ্ধার ৩০ জন

মিসরের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে মিসরের স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি।

বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতা

মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি বাংলাদেশিদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে দূতাবাস খোঁজখবর নিচ্ছে।

দূতাবাস আরও জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় ১১ বাংলাদেশির প্রাণহানির ঘটনায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপদ ও বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সর্বাধিক পঠিত

শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে শিক্ষা বোর্ড সচিবের অপসারণ দাবি, এমএম কলেজে বিক্ষোভ

ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন বিকল, প্রাণ গেল ১১ বাংলাদেশির

আপডেট: ০৮:২১:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

:অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। খাবার ও পানির সংকট এবং নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে অন্তত ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আরও ১৮ বাংলাদেশিকে। তাদের মিসরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। নৌকাটিতে থাকা ৩৮ জনই বাংলাদেশি ছিলেন।

যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পর নৌকাটি ঝড়ের কবলে পড়ে। এতে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা চালিয়ে যেতে বাধ্য হন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা।

গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে। খাবার ও পানির সংকটে একের পর এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল হেকিমের ছেলে আবদুল করিম জানান, ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর তাদের উদ্ধারে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি। খাবার ও পানি না থাকায় তাদের চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা যান। পরে আরও দুজনের মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ সময় সাগরে থাকার কারণে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা। এভাবে টানা প্রায় নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। পরে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে।

আবদুল করিম বলেন, দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ও পচন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং চিকিৎসকরা তাদের প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসা দিচ্ছেন। দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এদিকে আবদুল করিমের সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার বিষয়টি তার পরিবার জানত না। তার মা আকলিমা বেগম জানান, ছেলে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার বিষয়ে পরিবারকে কিছু বলেনি।

আবদুল করিমের মামা ও পাথারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুর রাজ্জাকও জানান, ভাগনে সৌদি আরবে থাকতেন। সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পরিকল্পনার বিষয়টি তারা আগে জানতেন না।

মিসরে উদ্ধার ৩০ জন

মিসরের স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে।

তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে মিসরের স্থানীয় পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি।

বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতা

মিসরে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসার বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি বাংলাদেশিদের চিকিৎসার অগ্রগতি ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে দূতাবাস খোঁজখবর নিচ্ছে।

দূতাবাস আরও জানিয়েছে, আহত বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় ১১ বাংলাদেশির প্রাণহানির ঘটনায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপদ ও বৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।