বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র থেকে নিয়মিত অবৈধ অর্থ আদায়, ভুয়া ভাউচার ব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, বিভিন্ন বাস ও ট্রাক ডিপো, ওয়ার্কশপ এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে নিয়মিতভাবে কথিত ‘মাসোহারা’ আদায় করা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে সরাসরি নগদ অর্থ গ্রহণের পাশাপাশি ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল বাস ডিপোর ভেতরে প্রতিদিন বিআরটিসির প্রধান কার্যালয়ের জন্য দুপুরের খাবার রান্না করা হয়। এ খাবারের ব্যয় দেখিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার ভাউচার তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, সরাসরি নগদ অর্থ লেনদেনের বিষয়টি আড়াল করতেই খাবারের নামে এসব ভাউচার ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে ভাউচারগুলোর প্রকৃত ব্যবহার ও ব্যয়ের বৈধতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি ও হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিট থেকে কথিত নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
- ২৪টি বাস ডিপো: ডিপোভেদে গাড়িপ্রতি প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার টাকা এবং কাউন্টার থেকে গড়ে ৪৫ হাজার টাকা করে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের হিসাবে, ২৪টি ডিপো থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা আদায়ের দাবি করা হয়েছে।
- তেজগাঁও ট্রাক ডিপো: মাসে প্রায় ১১ লাখ টাকা।
- চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো: মাসে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
- সিডব্লিউএস ও আইসিডব্লিউএস: দুই কারখানা থেকে মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
- ৯টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট: সব মিলিয়ে মাসে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
তবে অভিযোগকারীদের দেওয়া এসব হিসাবের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে বিআরটিসির হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, ভাউচার ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোর আর্থিক নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৪টি ডিপো থেকে এককালীন ১১ থেকে ১৬ লাখ টাকা করে মোট প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নগদ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
তাদের দাবি, এ ধরনের অর্থ উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো সময় চালক ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধেও বিলম্ব হয়েছে।
অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অফিস কক্ষ সংস্কারের জন্য প্রায় ৫৬ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করে এর একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার পরিচালন ব্যয় ১৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন খাতে বাজেট বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে অনুমোদিত বাজেট, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাণ ও বাস্তব ব্যয়ের তুলনামূলক নিরীক্ষা প্রয়োজন।
বিআরটিসির বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, কথিত অর্থ আদায়ের কারণে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে তদন্ত করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
দুর্নীতির এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি উঠেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোনোভাবেই ব্যক্তিগত সুবিধা বা অবৈধ লেনদেনে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ডিপো ও ওয়ার্কশপের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, বাজেট অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআরটিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা—তা নির্ধারণের একমাত্র পথ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।





















