ঘুষ গ্রহণ এবং করদাতার আয়কর নথির মূল রেকর্ড পরিবর্তনের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সহকারী কর কমিশনার (সাময়িক বরখাস্ত ও বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মিজ জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুর পদোন্নতি আগামী আট বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কর-১ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই প্রজ্ঞাপনে তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল-৯৩-এ সহকারী কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু করদাতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের আয়কর নথির মূল রেকর্ডপত্র পরিবর্তন করে নতুন রেকর্ড সংযোজন করেন। এর বিনিময়ে করদাতার মনোনীত প্রতিনিধি আয়কর আইনজীবী মো. ওবায়দুল হক সরকার ও তাঁর সহকারী সোহেলের কাছ থেকে নগদ ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া পুরোনো আয়কর রিটার্ন, অর্ডার শিট, কর নির্ধারণী আদেশ, আপিল ও ট্রাইব্যুনাল আদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা (মামলা নং-০১/২০১৬) করা হয়। ওই বছরের ১৮ মার্চ তাঁর ব্যক্তিগত শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
তদন্তে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই বিধিমালার বিধি ৩(ঘ) অনুযায়ী ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে তাঁকে ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর শাস্তি হিসেবে আট বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখার লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এতে স্বাক্ষর করেছেন ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব।
৩৮ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ
প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত তথ্যের বাইরে, এসএ গ্রুপের কর্ণধার ও এসএ পরিবহনের মালিক সালাহ উদ্দিন আহমেদের আয়কর নথি ঘিরে আগেও অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
অভিযোগ ছিল, ১২ করবর্ষের আয়কর নথিতে ২৩৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকার আয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের করফাঁকির চেষ্টা করা হয় এবং এ জন্য ১ কোটি টাকার ঘুষের চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে আয়কর আইনজীবী মো. ওবায়দুল হক সরকার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুকে প্রথম কিস্তি হিসেবে ৩৮ লাখ টাকা দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এর বিনিময়ে ১২ করবর্ষের আয়কর রিটার্নসহ গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নথি আইনজীবীর কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জান্নাতুল ফেরদৌস মিতুকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ওই সময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তৎকালীন সচিব মো. আবদুর রহমান খানের সই করা প্রজ্ঞাপনে তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানানো হয়।
তৎকালীন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে করদাতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের মনোনীত আয়কর আইনজীবীকে গুরুত্বপূর্ণ আয়কর নথিপত্র সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নথিগুলোর মধ্যে পূর্ববর্তী কর রিটার্ন, অর্ডার শিট, কর নির্ধারণী আদেশ, আপিল ও ট্রাইব্যুনাল আদেশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল।
সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি-১২ অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে সে সময় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
তবে সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে আট বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ‘দুর্নীতিপরায়ণ’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।




















