১০:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পদ্মা রেল প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:১৩:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫১৯

দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সরকারি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর পরও মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয়, প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ আমদানিসহ অন্তত ২০টি অডিট আপত্তি উঠেছে।

অডিট প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের সঙ্গে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দায়ের বিষয়টি উল্লেখ করে অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ আদায় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগের পরও আফজাল হোসেন বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে।

পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির বাইরে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনাকাটায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অনুসন্ধানেও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দুদকের আবেদনে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর সন্তানদের নামে অর্থ রাখার তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।

গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত সরকারি বিশেষ নিরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে নিয়ে এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি ও একাধিক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ২০টি অডিট আপত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

নিরীক্ষায় মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অডিটের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নকশা পরিবর্তনের পরও অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ আমদানি, প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি দামে চুক্তি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে।

সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি এসেছে ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণের কাজে।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণে মূল নকশার তুলনায় গড়ে ১ দশমিক ৭ মিটার কম উচ্চতায় মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন কাজ কম করা হলেও ঠিকাদারকে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এতে সরকারের ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

২০১৬ সালে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের সঙ্গে প্রকল্পটির ইপিসি চুক্তি হয়। চুক্তিতে রেললাইনের বাঁধ নির্মাণের গড় উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। পরে সর্বশেষ জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার নির্ধারণ করা হয়।

২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি প্রকল্প পরিচালককে জানায়। পরে সংশোধিত নকশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

অডিটের ভাষ্য, নকশা পরিবর্তনের ফলে মাটি ভরাট, পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, ব্রিজ ও কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু কাজের পরিমাণ কমার পরও বিল অব কোয়ান্টিটিজ বা বিওকিউ অনুযায়ী শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

অডিট বলছে, এসব ছিল পরিমাপযোগ্য কাজ। অর্থাৎ যতটুকু কাজ হওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবে যতটুকু হয়েছে, বিলও সে অনুযায়ী হওয়ার কথা।

চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের হিসাবে, ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ডলার বা প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনো ডলার পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করে অডিট অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়েছে বলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি।

তবে এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

অডিটের মতে, বিওকিউতে দর বাংলাদেশি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য সমন্বয়ও করা হয়েছে। ফলে বর্তমান ডলার বিনিময় হার প্রয়োগ করাই যৌক্তিক।

চুক্তির জিসিসি ২.৫ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ পরবর্তী বিল থেকে কেটে রাখার সুযোগ থাকলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তা করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

অডিটের আরেকটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল আমদানি করা হয়েছে।

এ কারণে ঠিকাদারকে সিডি, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সরকারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-গেন্ডারিয়া তৃতীয় লাইন, ভাঙ্গা জংশন, রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া ও পদ্মবিলা জংশনসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়।

তবে এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি অডিট।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অডিট অনুযায়ী—

  • মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় গড়ে ২০০ মিলিমিটার কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
  • টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
  • দেশীয় মালামালের মূল্য বাংলাদেশি টাকার পরিবর্তে ডলারে পরিশোধ করে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।
  • প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রাক্কলনের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
  • পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
  • একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে অতিরিক্ত অনুদান দেওয়ায় ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • ব্যালাস্টের পুরুত্ব কম দিয়েও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
  • উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কিনতে ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
  • সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দিয়ে এফডিআরে রাখায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে।
  • ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
  • প্রভিশনাল সামের ওপর ওভারহেড চার্জ দিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণে পরামর্শককে অনিয়মিত অর্থ পরিশোধের অভিযোগও তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয়’ বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

অডিট কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম কাজ অথবা চুক্তির বাইরে ব্যয় দেখিয়েও ঠিকাদারকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায়, সরকারি কোষাগারে জমা এবং দায়ী ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে অডিট।

পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির পাশাপাশি রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগের পর রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব খালেদা আখতারের স্বাক্ষর করা চিঠি গত ২ জুলাই সংশ্লিষ্টদের পাঠানো হয়। চিঠিতে ৬ জুলাই প্রমাণপত্রসহ শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল।

তবে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগের আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।

তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্ত বা অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

তিনি বলেন, তদন্তে মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, রেলের কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাঁর মতে, এত বড় অভিযোগের পর তদন্তের স্বার্থে রেলের ডিজিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারত। কিন্তু তা না করে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হলে জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা যায়।

অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের ডিজি মো. আফজাল হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি জানান, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না। অডিটে উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রেলের মহাপরিচালক বা অন্য কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা অনিয়মের বিষয়গুলো সরকার নজরে রেখেছে।

তিনি বলেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।

তবে সরকারি অডিটে উত্থাপিত ২০টি আপত্তিতে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুপারিশ—সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, কাজের পরিমাণ ও বিলের অসামঞ্জস্য এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

সর্বাধিক পঠিত

বেনাপোলে চেকপোস্টে পুলিশের অভিযান, ভারতীয় মাদক সিরাপসহ গ্রেপ্তার ১

পদ্মা রেল প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি

আপডেট: ১২:১৩:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে সরকারি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর পরও মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয়, প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল পরিশোধ, নিম্নমানের কাজের বিপরীতে অর্থ ছাড় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ আমদানিসহ অন্তত ২০টি অডিট আপত্তি উঠেছে।

অডিট প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের সঙ্গে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের দায়ের বিষয়টি উল্লেখ করে অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ আদায় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগের পরও আফজাল হোসেন বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন ও বিস্ময় তৈরি হয়েছে।

পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির বাইরে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনাকাটায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অনুসন্ধানেও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দুদকের আবেদনে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর সন্তানদের নামে অর্থ রাখার তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।

গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত সরকারি বিশেষ নিরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে নিয়ে এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথি ও একাধিক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ২০টি অডিট আপত্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

নিরীক্ষায় মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অডিটের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নকশা পরিবর্তনের পরও অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত উপকরণ আমদানি, প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি দামে চুক্তি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি বিল দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে।

সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি এসেছে ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণের কাজে।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণে মূল নকশার তুলনায় গড়ে ১ দশমিক ৭ মিটার কম উচ্চতায় মাটি ভরাটসহ বিভিন্ন কাজ কম করা হলেও ঠিকাদারকে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এতে সরকারের ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

২০১৬ সালে চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের সঙ্গে প্রকল্পটির ইপিসি চুক্তি হয়। চুক্তিতে রেললাইনের বাঁধ নির্মাণের গড় উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। পরে সর্বশেষ জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার নির্ধারণ করা হয়।

২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিষয়টি প্রকল্প পরিচালককে জানায়। পরে সংশোধিত নকশা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

অডিটের ভাষ্য, নকশা পরিবর্তনের ফলে মাটি ভরাট, পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, ব্রিজ ও কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু কাজের পরিমাণ কমার পরও বিল অব কোয়ান্টিটিজ বা বিওকিউ অনুযায়ী শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

অডিট বলছে, এসব ছিল পরিমাপযোগ্য কাজ। অর্থাৎ যতটুকু কাজ হওয়ার কথা ছিল এবং বাস্তবে যতটুকু হয়েছে, বিলও সে অনুযায়ী হওয়ার কথা।

চূড়ান্ত মূল্যায়নের পর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের হিসাবে, ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ডলার বা প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল দেওয়া হয়েছে এবং অতিরিক্ত কোনো ডলার পরিশোধ করা হয়নি। বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করে অডিট অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়েছে বলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি।

তবে এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

অডিটের মতে, বিওকিউতে দর বাংলাদেশি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মূল্য সমন্বয়ও করা হয়েছে। ফলে বর্তমান ডলার বিনিময় হার প্রয়োগ করাই যৌক্তিক।

চুক্তির জিসিসি ২.৫ ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত পরিশোধিত অর্থ পরবর্তী বিল থেকে কেটে রাখার সুযোগ থাকলেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তা করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

অডিটের আরেকটি আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল আমদানি করা হয়েছে।

এ কারণে ঠিকাদারকে সিডি, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সরকারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-গেন্ডারিয়া তৃতীয় লাইন, ভাঙ্গা জংশন, রূপদিয়া, সিঙ্গিয়া ও পদ্মবিলা জংশনসহ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়।

তবে এই ব্যাখ্যাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেনি অডিট।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বেশ কিছু বড় অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অডিট অনুযায়ী—

  • মূল স্পেসিফিকেশনের তুলনায় গড়ে ২০০ মিলিমিটার কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
  • টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
  • দেশীয় মালামালের মূল্য বাংলাদেশি টাকার পরিবর্তে ডলারে পরিশোধ করে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।
  • প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে প্রাক্কলনের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
  • পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
  • একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে অতিরিক্ত অনুদান দেওয়ায় ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
  • অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • ব্যালাস্টের পুরুত্ব কম দিয়েও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
  • উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কিনতে ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
  • সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
  • অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দিয়ে এফডিআরে রাখায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে।
  • ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
  • প্রভিশনাল সামের ওপর ওভারহেড চার্জ দিয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণে পরামর্শককে অনিয়মিত অর্থ পরিশোধের অভিযোগও তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয়’ বলে মন্তব্য করেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।

অডিট কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম কাজ অথবা চুক্তির বাইরে ব্যয় দেখিয়েও ঠিকাদারকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায়, সরকারি কোষাগারে জমা এবং দায়ী ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে অডিট।

পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির পাশাপাশি রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগের পর রেলপথ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব খালেদা আখতারের স্বাক্ষর করা চিঠি গত ২ জুলাই সংশ্লিষ্টদের পাঠানো হয়। চিঠিতে ৬ জুলাই প্রমাণপত্রসহ শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়েছিল।

তবে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।

দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগের আর্থিক লেনদেন যাচাই করতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহযোগিতা চেয়েছে দুদক।

তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্ত বা অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে; অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তি ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এত বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

তিনি বলেন, তদন্তে মন্ত্রণালয়, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, রেলের কর্মকর্তা বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাঁর মতে, এত বড় অভিযোগের পর তদন্তের স্বার্থে রেলের ডিজিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারত। কিন্তু তা না করে তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হলে জবাবদিহির ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা যায়।

অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের ডিজি মো. আফজাল হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি জানান, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে।

তাঁর ভাষ্য, অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না। অডিটে উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।

রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রেলের মহাপরিচালক বা অন্য কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা অনিয়মের বিষয়গুলো সরকার নজরে রেখেছে।

তিনি বলেন, প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।

তবে সরকারি অডিটে উত্থাপিত ২০টি আপত্তিতে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুপারিশ—সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, চুক্তির শর্ত পরিবর্তন, কাজের পরিমাণ ও বিলের অসামঞ্জস্য এবং ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।