মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধাপে অর্থ আদায়, নিম্নমানের কাজের বিল পরিশোধ এবং সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ না করলেও অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় কমিশন আদায় করা হয়।
দুই মাস ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে একাধিক ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, কার্যাদেশ গ্রহণ থেকে শুরু করে কাজের পরিমাপ, বিল প্রস্তুত, অনুমোদন এবং চেক গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপেই নির্ধারিত হারে কমিশন দিতে হয়। কমিশনের অর্থ পরিশোধ না করলে ফাইল আটকে রাখা, বিলম্ব করা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলা হয় বলেও অভিযোগ তাদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগের দুই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) কাজের বিনিময়ে নির্ধারিত হারে অর্থ দেওয়ার কথা বলেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, চুক্তিমূল্যের উল্লেখযোগ্য অংশ কমিশন হিসেবে আদায় করা হয় এবং এর একটি অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদকের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ সম্পন্নের আগেই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে উপসহকারী প্রকৌশলী, এসডিই এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে কমিশন ভাগাভাগির পর বিলে স্বাক্ষর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ২২ কোটি টাকার বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে আবাসিক, অনাবাসিক, স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রকল্পের কয়েকটিতে নিম্নমানের কাজ এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল পরিশোধের ঘটনা ঘটেছে। একই ধরনের অভিযোগ চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের কিছু প্রকল্প নিয়েও রয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় নির্বাহী প্রকৌশলীকে অফিসে পাওয়া যায় না। তারা দাবি করেন, সাধারণ ঠিকাদাররা দাপ্তরিক সহযোগিতা না পেলেও নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে তিনি নিয়মিত বৈঠক করেন। এছাড়া সরকারি সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকার অভিযোগও তুলেছেন তারা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের একটি ওয়ার্ডে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে এক রোগী আহত হন। এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে সংস্কার কাজ হওয়ার পরও কেন হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হাসপাতাল-২, ইন্টার্নি ছাত্র হোস্টেল, স্টাফ কোয়ার্টার, জরুরি বিভাগ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ওপিডিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ম্যানুয়াল কোটেশনের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় বা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে সন্দেহ রয়েছে।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তরিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।





















