দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং গ্রাহকের বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেড এখন চরম সংকটের মুখে রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অবসায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যেই বীমা খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা মো. মোস্তাফিদুজ্জামানকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার-অ্যাক্টিং) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহকের ৪ হাজার ৪০৩ কোটি টাকারও বেশি বীমা দাবি বকেয়া ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি বছরই এই বকেয়া দাবির পরিমাণ বাড়ছে, যা পুরো বীমা খাতের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২১ মে থেকে মো. মোস্তাফিদুজ্জামান পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে কোম্পানিটি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে চিঠিও দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, মোস্তাফিদুজ্জামানের বীমা খাতে সরাসরি কাজের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একই সঙ্গে তিনি এস আলম গ্রুপের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বলেও বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বীমা খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতে অভিজ্ঞতাহীন কাউকে শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা ইসলামী লাইফ বর্তমানে আর্থিক সংকট, সুশাসনের অভাব এবং নানা অনিয়মে জর্জরিত। তাদের ভাষ্য, দক্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন ভারপ্রাপ্ত সিইও দায়িত্ব নেওয়ার পর কোম্পানির বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোরশেদ আলম সিদ্দিকীকে পরিচালনা পর্ষদ পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আমি আর পদ্মা লাইফে থাকছি না। আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানি বিভিন্ন সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এসব সম্পদ কিনতে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না বলেও তারা জানান।
তাদের আরও দাবি, কোম্পানির কার্যক্রম অদৃশ্যভাবে এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছে।এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিদুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তার মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের মোট বীমা দাবির পরিমাণ ২৬৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে কোম্পানিটি পরিশোধ করেছে মাত্র ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ফলে গ্রাহকদের প্রায় ২৬০ কোটি ৯০ লাখ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে ১৭৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তবে বিপুল পরিমাণ বকেয়া দাবির তুলনায় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার রয়েছে ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ শেয়ার। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের সংখ্যা ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৮০ হাজার।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বীমা দাবি নিষ্পত্তি তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রয়োজন হলে সরকারের কাছে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে।
তিনি জানান, জীবন ও সাধারণ—উভয় ধরনের বীমা কোম্পানির মিলিয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার দাবি এখনো অনিষ্পন্ন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, বীমা দাবি পরিশোধ করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আইনগত বাধ্যবাধকতাও।
নতুন ভারপ্রাপ্ত সিইও সম্পর্কে তিনি বলেন, “তার সরাসরি বীমা খাতের অভিজ্ঞতা না থাকলেও নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে। দক্ষ টিম থাকলে তিনি কার্যক্রমে গতি আনতে পারেন।”




















