মমতা ব্যানার্জীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হয়তো সবচেয়ে বড় মোড়টি এসেছে এবার। পশ্চিমবঙ্গে টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর এখন তিনি আবারও রাজনীতির মাঠে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। আর সেই পথেই তিনি ডেকেছেন এক সময়ের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বাম ও অতিবাম শক্তিকেও।
নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী যখন কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড-এ শপথ নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই দিনই কয়েক মাইল দূরে নিজের বাসভবন থেকে মমতা ব্যানার্জী বিজেপিবিরোধী সব শক্তিকে এক হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে এখন সবাইকে একজোট হতে হবে এবং “শত্রুর শত্রুই বন্ধু”— এমন মানসিকতা নিয়েই তিনি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। এমনকি কখন তাকে বাসায় পাওয়া যাবে, তাও খোলাখুলি জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আহ্বান শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি মমতার রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত। কারণ ২০১১ সালে যে নেত্রী বামফ্রন্ট-এর ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, তিনিই এখন সেই বামপন্থিদের সহযোগিতা চাইছেন।
১৯৭৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নারী কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে উত্থান শুরু হয় মমতা ব্যানার্জীর। পরে যুব কংগ্রেসের নেতৃত্বেও আসেন তিনি।
১৯৮৪ সালে সোমনাথ চ্যাটার্জীকে যাদবপুর লোকসভা আসনে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তোলেন তিনি। তখন তাকে ভারতের কনিষ্ঠতম সংসদ সদস্যদের একজন হিসেবে দেখা হয়।
পরবর্তীতে কংগ্রেস ছেড়ে ১৯৯৮ সালে গঠন করেন তৃণমূল কংগ্রেস। খুব অল্প সময়েই দলটি পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়।
বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষিজমি রক্ষার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান মমতা।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে। মমতা ব্যানার্জী হন রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী।
ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কয়েক বছর জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হলেও, পরবর্তীতে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং কর্মসংস্থানে ব্যর্থতার অভিযোগে চাপে পড়ে তৃণমূল সরকার।
বিরোধীদের অভিযোগ, গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের শিল্পায়ন হয়নি, নতুন বিনিয়োগও আসেনি। পাশাপাশি তৃণমূলের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যদিও দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করত, ব্যক্তিগতভাবে মমতা ব্যানার্জী দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। তার সাদামাটা জীবনযাপন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ এবং প্রতিবাদী চরিত্র তাকে আলাদা জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন মমতার সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
প্রথমত, নির্বাচনি পরাজয়ের পর তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারেন কি না। কারণ তৃণমূলের ভেতরে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে ঘিরে দলীয় অসন্তোষ ও দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে সামাল দেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, বিরোধী নেত্রী হিসেবে নিজের পুরনো আন্দোলনমুখী চরিত্র তিনি আবার ফিরিয়ে আনতে পারেন কি না। বিজেপি সরকারের কোনো ভুলকে কেন্দ্র করে রাজপথে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে তিনি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে বয়স ও শারীরিক সীমাবদ্ধতা এখন তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৭০ পেরোনো মমতা আগের মতো দীর্ঘ সময় রাজপথে সক্রিয় থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা হারানোর পর খুব কম দলই পুনরায় ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছে। এখন দেখার বিষয়, মমতা ব্যানার্জী সেই ইতিহাস বদলে নতুন অধ্যায় লিখতে পারেন কি না।




















