চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসানকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, বিচারাধীন মামলা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা তিনটি বিশেষ মামলায় তিনি আসামি। মামলাগুলো বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সিডিএতে দায়িত্ব পালনকালে ইমারত নির্মাণের নকশা অনুমোদন, সংশোধিত নকশা পাস এবং ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অনুমোদনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ও অভিযুক্তের বক্তব্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে ২০১০ সালে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়। অনুসন্ধানে ১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। এ ঘটনায় চান্দগাঁও থানায় দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
মামলাগুলোর নম্বর ৪০/২০১২, ৪১/২০১২ ও ৪৩/২০১২। ২০১২ সালের মে মাসে দুদক তদন্ত শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সিডিএর তৎকালীন কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে কাজের অনিয়ম এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। মোহাম্মদ হাসানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিচার এখনো সম্পন্ন না হয়ে থাকলে, তাঁদের দায় নির্ধারণের বিষয়টি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
## বিচারাধীন মামলা, তবুও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব
মামলাগুলো বিচারাধীন থাকার সময়ও মোহাম্মদ হাসান সিডিএর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একপর্যায়ে তিনি ইমারত নকশা অনুমোদন ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ‘অথরাইজড অফিসার-১’ পদে আসীন হন।
এ নিয়ে প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নিয়োগ ও পদায়নের নীতিমালা অনুসরণের প্রশ্ন উঠেছে। গুরুতর দুর্নীতির মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত কোনো কর্মকর্তা বিচারাধীন অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে থাকলে, তাঁর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক পর্যালোচনা করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে শুধু মামলা চলমান থাকার কারণে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং প্রযোজ্য চাকরিবিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়টি পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
সিডিএর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে অভিযোগ উঠেছে, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভবনের অতিরিক্ত তলা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া, অননুমোদিত নকশা অনুমোদন এবং সংশোধিত নকশা পাসের ক্ষেত্রে অনিয়মের একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় ছিল।
অভিযোগের তির মোহাম্মদ হাসান এবং তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার দিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের কার্যকালে সংস্থাটির অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় গড়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট ভবনের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ কিংবা কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নকশা অনুমোদনের ফাইল, সংশোধিত পরিকল্পনা, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন বিতর্ক ও প্রশাসনিক অসন্তোষের মধ্যে ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর মোহাম্মদ হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সিডিএর চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা প্রয়োগ করে সংস্থাটির সচিব রবীন্দ্র চাকমা স্বাক্ষরিত আদেশে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
পরবর্তী সময়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁকে ‘অথরাইজড অফিসার-১’ পদ থেকে অপসারণ করে। একই সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজকে ওই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
এই প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো কেন নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে বিচারাধীন মামলার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
কালুরঘাট প্রকল্পের মামলায় মোহাম্মদ হাসান ছাড়াও সিডিএর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীসহ একাধিক কর্মকর্তার নাম অভিযোগপত্রে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ অবস্থায় শুধু একজন কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে নয়, বরং প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র, বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ এবং তদারকির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা জরুরি। প্রকল্পের অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে, কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান যথাযথ ছিল কি না এবং কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর্থিক সুবিধা পেয়েছে কি না—তা নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নগর পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণের অনুমোদনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগের নিষ্পত্তি, বিভাগীয় তদন্তের ফল প্রকাশ এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা এবং বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সিডিএ কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।




















