নেত্রকোনার বারোঘর গ্রামে বাড়ি, জমি, মাছের ঘের, রাজধানীতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ব্যাংকে বিপুল অর্থ—রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরী এবং তাঁর পরিবারের সম্পদ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কর্মস্থলে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব সম্পদের উৎস এবং অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্রামের বাড়িতে একাধিক স্থাপনা, জমি ও মাছের ঘের ছাড়াও রাজধানীর গুলশান এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ জমা ও স্থায়ী আমানত রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, আর্থিক মূল্য এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনার বারোঘর গ্রামে তুহিন চৌধুরীর নামে একাধিক বাড়ি, জমি ও মাছের ঘের রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে প্রায় ১৫ থেকে ২০ একর জমির কথা উল্লেখ করে এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর গুলশান ও আশপাশের এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট থাকার অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে একটি ফ্ল্যাটের মূল্য আনুমানিক ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
তুহিন চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, বাড়ি, ব্যাংক আমানত এবং অন্যান্য সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ও অর্থের উৎস যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
তুহিন চৌধুরীর বাবা চন্দন চৌধুরী একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁর মা নিলিমা দেবনাথও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাঁদের নামে গ্রামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও অন্যান্য সম্পদ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের বরাতে পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ও অর্জনের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সম্পদের মালিকানা, ক্রয়ের সময়কাল, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ এবং বৈধ আয়ের তথ্য যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তুহিন চৌধুরী যশোর, ঢাকা বন্ড কমিশনারেট, তামাবিল ও চট্টগ্রাম কাস্টমসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আদায়, ফাইল নিষ্পত্তিতে অনিয়ম, ঘুষ দাবি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালনের সময়ও আর্থিক অনিয়ম ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকজন ব্যবসায়ীর বক্তব্যের বরাতে দাবি করা হয়েছে, পণ্যের শুল্কায়ন, ফাইল নিষ্পত্তি এবং আমদানিকারকদের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে একটি আমদানি চালানের শুল্কায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট চালানের নথি, রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ এবং এ ঘটনায় তুহিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত দায় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ১৩টি চালানে মোট ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেত্রকোনায় পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি মূল্যবান ইলেকট্রনিক সামগ্রী পাঠানোর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে এসব চালানের সঙ্গে তুহিন চৌধুরী ও তাঁর পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার দাবি করা হয়েছে। একজন প্রাপকের বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি তুহিন চৌধুরীর পাঠানো অর্থ গ্রহণ করে নির্দেশিত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য থাকলেই তা অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ হয়ে যায় না। চালান, অর্থের উৎস, প্রেরক-প্রাপকের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের উদ্দেশ্য যাচাই করে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তুহিন চৌধুরী রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের অধীন হিলি স্থল কাস্টমস স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। গত ১৬ জুলাই তাঁকে বুড়িমারী স্থল কাস্টমস স্টেশনে বদলির বিষয়ে একটি দাপ্তরিক আদেশ জারি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা যায়নি।
একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে তাঁর অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্য থাকা সুশাসন ও জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কোনো কর্মকর্তার সম্পদের উৎস নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ উঠলে তা নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থা সম্পদের বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, জমির দলিল ও সম্পদ অর্জনের সময়কাল পরীক্ষা করতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তুহিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সম্পদের প্রকৃত উৎস যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টির স্বচ্ছ নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।




















