রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে (বিএসসি) নাবিক নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতিতে বিধিবহির্ভূত প্রক্রিয়া, জাহাজ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তদন্তে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। অভিযোগ পাওয়ার প্রায় ১০ মাস পর আগামী ২৯ জুলাই সকাল ১১টায় মন্ত্রণালয়ে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমানের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। অভিযোগে বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ, মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌংসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যুগ্মসচিব (জাহাজ) মোহাম্মদ এমরান হোসেনকে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে চলতি বছরের ১৫ জুলাই জারি করা নোটিশে সংশ্লিষ্টদের আগামী ২৯ জুলাই শুনানিতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য এবং স্বপক্ষের প্রমাণাদি নিয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএসসির একজন স্থায়ী প্রধান প্রকৌশলীকে (চিফ ইঞ্জিনিয়ার) বিধি অনুযায়ী তিন মাসের বেশি অন-স্টাফ রাখার সুযোগ না থাকলেও প্রায় এক বছর অফিসে রাখা হয়। একই সময়ে ঘুষের বিনিময়ে ছয়জনকে চুক্তিভিত্তিক প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুইজনকে মাসিক ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার এবং চারজনকে মাসিক ১২ হাজার মার্কিন ডলার বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে স্থায়ী কর্মকর্তার বেতনসহ বিএসসির উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, অদক্ষ চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের কারণে বিএসসির জাহাজ বিদেশি বন্দরে জরিমানা ও ডিমেরিট পয়েন্টের মুখে পড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজগুলো উচ্চমূল্যে চার্টার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েক মাস আগে একটি জাহাজ দুর্ঘটনার পর সেটি উদ্ধারে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ মেরামত বিভাগে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে অতিমূল্যে যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে।
পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের একটি অডিট আপত্তির উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, মেরামতের অযোগ্য দুটি জাহাজ—‘এমটি বাংলার জ্যোতি’ ও ‘এমটি বাংলার সৌরভ’—মেরামতের নামে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৭৬ হাজার ৯২৭ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বিএসসি মেরিন ওয়ার্কশপের অপারেটিভ কর্মচারীদের পদোন্নতির আগে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি বাছাই উপকমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ।
অভিযোগ অনুযায়ী, অধিক যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন কয়েকজন কর্মচারীকে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হয়, যা বিএসসির চাকরি প্রবিধানমালা ও পদোন্নতি নীতিমালার পরিপন্থী।
এছাড়া এক কর্মচারীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার কথিত স্বীকারোক্তির বিষয়ও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ওই বক্তব্য মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা হলেও পরে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারী দাবি করেছেন, বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (প্রযুক্তি) পদ প্রায় আট বছর এবং নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে চলতি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া বিএসসির বিভিন্ন বিভাগে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং এসব তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ ঠেকাতে প্রশাসনিক বাজেট থেকে অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, শুনানিতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে—
- বিএসসির নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ
- অভিযোগকারী ও বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (দূরপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়া) মো. আতাউর রহমান
- মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো. জিয়াউর রহমান চৌং
- রেকর্ড কিপার ও সিবিএ নেতা মো. আতিকউর রহমান
- মেরিন ওয়ার্কশপের ফোরম্যান ও সিবিএ নেতা মো. নাজমুল আহসান
তাদের অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি নিয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।




















