০৩:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রূপালী লাইফে দুর্নীতি আড়ালের অভিযোগ: অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা, ১২ লাখ গ্রাহকের আমানত নিয়ে শঙ্কা

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • ৫২৮

দেশের বিমা খাতে একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগের মধ্যে এবার আলোচনায় এসেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে পুনরায় সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ১২ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগসংক্রান্ত তদন্ত ফাইল দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে আটকে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই গোলাম কিবরিয়ার পুনর্নিয়োগের অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

গত বছরের ২২ জুলাই রূপালী লাইফের নিরীক্ষা বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার মো. জহিরুল ইসলাম গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ভুয়া ব্যবসা পরিচালনা এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইডিআরএ চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি এবং তদন্তও এগোয়নি।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, গোলাম কিবরিয়া বিতর্কিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া এমবিএ সনদ ব্যবহার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ২০১০ সালে এমবিএ পাস করেছেন বলে দাবি করলেও তার সনদে ২০১১ সালের উল্লেখ রয়েছে এবং ওই সময়ের সনদ পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছিল।

এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার নিয়ন্ত্রিত রূপালী লাইফে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন গোলাম কিবরিয়া। ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও তিনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

গত ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ পর্ষদ সভায় তাকে পুনরায় সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। পরে ১১ জুলাই চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফাইলটি আইডিআরএ-তে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আইডিআরএ সদস্য আপেল মাহমুদ তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছেন এবং গোলাম কিবরিয়ার পুনর্নিয়োগে ভূমিকা রাখছেন।

যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে আপেল মাহমুদ বলেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

তবে অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, সাংবাদিকের অনুসন্ধানের পর তিনি গোলাম কিবরিয়াকে ফোন করে সতর্ক করেছিলেন।

 

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করেছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে— বণ্টন না করা কমিশনের অর্থ আত্মসাৎ
* ভুয়া ভ্রমণ বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন
* ব্যক্তিগত গাড়ির নামে কাল্পনিক জ্বালানি ও গ্যারেজ বিল
* নিয়মিত ভুয়া মেডিকেল বিল তৈরি
* লাইফ ফান্ড থেকে বেআইনিভাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন
* আইটি বিভাগের সহায়তায় ডামি কোড তৈরি করে ভুয়া ব্যবসার নামে প্রিমিয়ামের অর্থ আত্মসাৎ

 

প্রতিষ্ঠানটির এক গ্রাহক রবিউল ইসলাম বলেন, বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইডিআরএ-তে দায়িত্বে থাকা যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানান তিনি। প্রয়োজন হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফের প্রধান কার্যালয়ে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সিইও গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং তদন্তে বিলম্বের বিষয়ে জানতে আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

 

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১২ লাখের বেশি গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

 

সর্বাধিক পঠিত

যশোরে ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ব্যবসায়ীর ২ বছরের কারাদণ্ড

রূপালী লাইফে দুর্নীতি আড়ালের অভিযোগ: অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা, ১২ লাখ গ্রাহকের আমানত নিয়ে শঙ্কা

আপডেট: ১০:০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

দেশের বিমা খাতে একের পর এক অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগের মধ্যে এবার আলোচনায় এসেছে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে পুনরায় সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির ১২ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগসংক্রান্ত তদন্ত ফাইল দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে আটকে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই গোলাম কিবরিয়ার পুনর্নিয়োগের অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

 

গত বছরের ২২ জুলাই রূপালী লাইফের নিরীক্ষা বিভাগের ডেপুটি ম্যানেজার মো. জহিরুল ইসলাম গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, ভুয়া ব্যবসা পরিচালনা এবং কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে অর্থ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইডিআরএ চেয়ারম্যানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশনা কার্যকর হয়নি এবং তদন্তও এগোয়নি।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, গোলাম কিবরিয়া বিতর্কিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া এমবিএ সনদ ব্যবহার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ২০১০ সালে এমবিএ পাস করেছেন বলে দাবি করলেও তার সনদে ২০১১ সালের উল্লেখ রয়েছে এবং ওই সময়ের সনদ পরবর্তীতে বাতিল করা হয়েছিল।

এই অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার নিয়ন্ত্রিত রূপালী লাইফে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন গোলাম কিবরিয়া। ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও তিনি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

গত ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ পর্ষদ সভায় তাকে পুনরায় সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০০ টাকা। পরে ১১ জুলাই চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফাইলটি আইডিআরএ-তে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, আইডিআরএ সদস্য আপেল মাহমুদ তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছেন এবং গোলাম কিবরিয়ার পুনর্নিয়োগে ভূমিকা রাখছেন।

যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে আপেল মাহমুদ বলেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হবে।

তবে অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, সাংবাদিকের অনুসন্ধানের পর তিনি গোলাম কিবরিয়াকে ফোন করে সতর্ক করেছিলেন।

 

অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গোলাম কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে কোম্পানির অর্থ আত্মসাৎ করেছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে— বণ্টন না করা কমিশনের অর্থ আত্মসাৎ
* ভুয়া ভ্রমণ বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন
* ব্যক্তিগত গাড়ির নামে কাল্পনিক জ্বালানি ও গ্যারেজ বিল
* নিয়মিত ভুয়া মেডিকেল বিল তৈরি
* লাইফ ফান্ড থেকে বেআইনিভাবে প্রায় ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন
* আইটি বিভাগের সহায়তায় ডামি কোড তৈরি করে ভুয়া ব্যবসার নামে প্রিমিয়ামের অর্থ আত্মসাৎ

 

প্রতিষ্ঠানটির এক গ্রাহক রবিউল ইসলাম বলেন, বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইডিআরএ-তে দায়িত্বে থাকা যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানান তিনি। প্রয়োজন হলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফের প্রধান কার্যালয়ে কয়েকদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সিইও গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং তদন্তে বিলম্বের বিষয়ে জানতে আইডিআরএ চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

 

রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১২ লাখের বেশি গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিমা খাতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।