ভক্তদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। এ বছর যশোরের আট উপজেলায় ৭৪৬টি মন্দির ও পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দমুখর করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় দেবীর বোধন, কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হবে। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গাপূজা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন ঘোষ জানান, দুর্গোৎসবের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে যশোর শহরের লালদিঘীর পুকুরপাড়ে সংগঠনের জেলা কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
এ কন্ট্রোল রুম থেকে সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), বিজিবি, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা হচ্ছে।
জরুরি প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের ০১৭১১৩২৫০৮০ নম্বরে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, বিকল্প আলোর ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপে সার্বক্ষণিক স্বেচ্ছাসেবক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রবীণদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে জেলার প্রতিটি উপজেলায় হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সম্প্রীতি শোভাযাত্রার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন বলেন, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য জোরদারেরও একটি উপলক্ষ। সবার সহযোগিতায় এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদ্যাপিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে যশোরের সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বৃহস্পতিবার যশোর ব্যাটালিয়ন (৪৯ বিজিবি) থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত ২৯টি এবং যশোর শহরের ২০টি পূজামণ্ডপে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় দিন-রাত টহল, রেকি ও মোবাইল পেট্রোল পরিচালনা করছেন বিজিবি সদস্যরা।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন, যশোরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মোট ২২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দুই হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা ৫২টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প থেকে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে এপিসি প্লাটুন ও বিশেষায়িত কে-৯ ডগ স্কোয়াড মোতায়েনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী বর্ডার আউটপোস্টগুলোতে (বিওপি) জনবল বাড়ানো হয়েছে।
যশোর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান জানান, পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে বিজিবি। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক রয়েছেন।
তিনি আরও জানান, তাৎক্ষণিক সহযোগিতা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।
পূজা উদযাপন পরিষদ, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে যশোরের আট উপজেলায় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে—এমন প্রত্যাশা তাঁদের।




















