: ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) মাতুয়াইল এনওসিএস কার্যালয়কে ঘিরে ঘুষ লেনদেন, মিটার কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর ডিজিটাল আলামত পরিবর্তন বা গোপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থাকা তথ্য-প্রমাণ সরিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য, মিটার রিডিং, ডিজিটাল লগ ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন, উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার, মো. মঞ্জুরুল কাদের, লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু ও ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়াসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার পরিবর্তন ও বিল সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবায় গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। অর্থ দিতে না চাইলে ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি ও সেবা বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।
তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর বিদ্যুৎ বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। উপসচিব মো. আবু লাইছের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে পিডিবির উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. বনি আমিন এবং ডিপিডিসির ম্যানেজার (আইসিটি) মো. হেলাল উদ্দিন রয়েছেন।
ডিজিটাল তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগ
তদন্ত শুরুর পর মাতুয়াইল ডিভিশনের আইসিটি শাখার লাইনম্যান মেট মো. ফিরোজ শেখের সহায়তায় বিভিন্ন মিটারের রিডিং, সার্ভারে থাকা তথ্য ও ডিজিটাল লগ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, তদন্তকে প্রভাবিত করতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। রাজধানীর গুলশান ও ধানমন্ডিতে এ নিয়ে বৈঠকের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ফিরোজ শেখ এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন তাঁর অভিভাবকের মতো এবং তিনি তাঁর নির্দেশ মেনে চলেন।
বিভিন্ন গ্রাহকের সংযোগে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগে কয়েকটি বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে অনিয়মের দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে তুষারধারার একটি বহুতল ভবনে উচ্চক্ষমতার (এইচটি) সংযোগের পরিবর্তে নিম্নক্ষমতার (এলটি) সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৪ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া তুষারধারার আরেক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এইচটি সংযোগকে এলটি সংযোগে রূপান্তর এবং অনুমোদিত পরিকল্পনার বাইরে অতিরিক্ত মিটার দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
রায়েরবাগের একটি রাবার ও টায়ার প্রতিষ্ঠানে মিটার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার, স্বামীবাগের একটি ভবনে পুরোনো নির্মাণ মিটার সরিয়ে নতুন মিটার স্থাপন এবং পলাশপুর ও তুষারধারার কয়েকটি বহুতল ভবনে এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া কয়েকটি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সোলার ব্যবস্থা ও পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (পিএফআই) ছাড়াই সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্য ডিভিশন থেকে মিটার এনে স্থাপনের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুতল ভবনে প্রয়োজনীয় এইচটি সংযোগের পরিবর্তে ঘুষের বিনিময়ে এলটি সংযোগ দেওয়ায় একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার, পুরোনো মিটার সরিয়ে ফেলা এবং মিটার রিডিং সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট একটি সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কাজ করা কঠিন এবং অর্থের বিনিময়ে সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে তাঁর বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর দাবি, মাতুয়াইল ডিভিশনের অনিয়মের সঙ্গে অন্য কয়েকজন জড়িত।
ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, তিনি কোনো অনিয়ম করেননি এবং অভিযোগে উল্লেখিত কোনো ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরত রাখা এবং সার্ভার, মিটার ডাটাবেস, লগ ফাইল, সিসিটিভি ফুটেজসহ সব ধরনের ডিজিটাল ও নথিভিত্তিক আলামত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।




















