দেশে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে রবি ও বোরো মৌসুমে সারের চাহিদার তুলনায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন বেশি সার সরবরাহের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী অক্টোবর মাসের জন্য দেশের ৬৪ জেলার চাহিদা অনুযায়ী টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার ১৪ সেপ্টেম্বরের চিঠি এবং সংযুক্ত জেলাওয়ারি বরাদ্দ তালিকা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে রবি ও বোরো মৌসুমে সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে ৫১ লাখ ৭১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ১৫ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন সার সরবরাহের প্রস্তুতি রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, অক্টোবর মাসে দেশের ৬৪ জেলার জন্য টিএসপি সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ হাজার ৫২ মেট্রিক টন। পুরো পরিমাণই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
একই মাসে ডিএপি সারের চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ১ হাজার মেট্রিক টন এবং বিএডিসি ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১০ মেট্রিক টন বরাদ্দ করেছে।
এ ছাড়া অক্টোবর মাসে এমওপি সারের চাহিদা ৯৩ হাজার ৬৫৪ মেট্রিক টন। এ পরিমাণ সারও জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন ধরনের নন-ইউরিয়া সারের অক্টোবর মাসের মোট চাহিদা ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সমপরিমাণ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথিতে প্রতিটি জেলার জন্য আলাদাভাবে সারের চাহিদা নির্ধারণ করে বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের কৃষি চাহিদার সঙ্গে সার সরবরাহের সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমদানি ও মজুতেও গুরুত্ব
সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জেলাভিত্তিক বরাদ্দের পাশাপাশি আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মোট ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির তিনটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এর মধ্যে বেলারুশ থেকে ৩০ হাজার টন এমওপি, মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি এবং সৌদি আরব থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানির প্রস্তাব রয়েছে।
এর আগে আগস্ট মাসেও বিভিন্ন দেশ থেকে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া এবং রাশিয়া থেকে এমওপি সার আমদানির প্রস্তাব ছিল।
গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ইউরিয়া সার ৪ লাখ ১৮ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৪৩ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ২ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টন মজুত ছিল।
এ ছাড়া পরিবহনের পথে ছিল টিএসপি ১ লাখ ২৮ হাজার ২০০ টন, ডিএপি ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮৯ হাজার ৪০০ টন সার।
সার ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি এবং ৬৪ জেলায় সার মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার ব্যবস্থাপনায় চাহিদা নিরূপণ, আগাম আমদানি, জেলাভিত্তিক বরাদ্দ এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহ পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষকের চাহিদাকে অগ্রাধিকার
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, সার ব্যবস্থাপনায় চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা ও আগাম প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় কতটুকু সার প্রয়োজন, কখন প্রয়োজন এবং কীভাবে তা কৃষকের কাছে পৌঁছানো হবে, এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও চাহিদার তুলনায় সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার নিশ্চিত করতে সরকার আগাম ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর মাসের জন্য টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদার বিপরীতে শতভাগ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু এলাকায় বিতরণে অনিয়মের কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক তৎপরতায় সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
সচিব বলেন, কৃষকের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে এবং ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। এ জন্য আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিতরণ কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোথাও ঘাটতি বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উৎপাদন মৌসুমের আগেই সারের চাহিদা নির্ধারণ ও বরাদ্দ নিশ্চিত করার ফলে কৃষকদের শেষ মুহূর্তে সার সংগ্রহের অনিশ্চয়তা কমবে বলে আশা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ সার। তাই আগাম চাহিদা নিরূপণ, পর্যাপ্ত মজুত, আমদানি ও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করা গেলে কৃষি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
ট্যাগ: সার মজুত, সার আমদানি, কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি উৎপাদন, রবি মৌসুম, বোরো মৌসুম, ইউরিয়া সার, টিএসপি সার, ডিএপি সার, এমওপি সার, কৃষক, বাংলাদেশ কৃষি




















