‘এখন থেকে ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে দৌড়াবে’—স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের এমন বক্তব্য ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছিল। দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পর সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে—এমন প্রশ্নের মুখে পড়লেও এর অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি। বরং বিষয়টি ‘অনেক পুরনো কথা’ বলে এড়িয়ে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসা, পুরোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং নতুন করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের উত্থান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একটি নতুন বলয় স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, কেনাকাটা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে ‘ভাগ্নি জামাই-ভাগিনা’ নামে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় হয়েছে। এ বলয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আপন ভাগ্নি জামাই হিসেবে পরিচিত যুগ্মসচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মুখ্যসচিবের কথিত ভাগিনা হিসেবে পরিচিত সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমানের নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পদায়নে এই বলয়ের প্রভাব রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের স্বাধীন ও চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো বহাল রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পর্যায়ের বেশ কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সর্বশেষ গত ৩০ জুলাই জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন অধ্যাপকের পদায়ন নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন এবং স্বাচিপের সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত ২২ জুন ২০২৬ তাকে জাতীয় কিডনি হাসপাতাল থেকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এক মাসের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে গত ৩০ জুলাই সেই বদলি আদেশ বাতিল করে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পদায়ন করা হয়।
এই পদায়নের পেছনে কোনো বিশেষ প্রভাব বা আর্থিক লেনদেন ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় অভিযোগ সরকারি হাসপাতালের এমএসআর (মেডিকেল সার্জিক্যাল রিকুইজিট) সামগ্রী কেনাকাটা নিয়ে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ আমলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন ঠিকাদার এখনো বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের এমএসআর কেনাকাটার কাজে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের মধ্যে মনিরুজ্জামান ঢালী ও এমদাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ঠিকাদারের নামে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকায় একই দরপত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
অনুসন্ধানে মনিরুজ্জামান ঢালীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে আটটি প্রতিষ্ঠানের নাম পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এগুলো হলো—ঢালী সাপ্লাই লিমিটেড, ঢালী করপোরেশন, আফাসি ফার্মা, ফরচুন মেডিকেল সিস্টেমস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড সার্জিক্যাল, আনিসা করপোরেশন, স্মার্ট মেডিকেল রিকুইজিট অ্যান্ড ফার্মা এবং ঈগন ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড।
অভিযোগকারীদের দাবি, টেন্ডারে এসব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে ব্যবহার করে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
এমনকি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টেন্ডার-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা প্রক্রিয়াগত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে অন্য দরদাতাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সুযোগ কমে যায় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এমএসআর সামগ্রী ক্রয়ের দরপত্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, ঢালী-সংশ্লিষ্ট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান একই দরপত্রে অংশ নেয় এবং নির্দিষ্ট কিছু আইটেমে তারা ধারাবাহিকভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দরপত্রে এমন কিছু অস্বাভাবিক আইটেম রাখা হয়, যেগুলোর নিয়মিত চাহিদা নেই। এসব আইটেম সম্পর্কে আগে থেকেই নির্দিষ্ট ঠিকাদাররা তথ্য পেয়ে থাকেন এবং তারা ওই আইটেমে দর না দিয়ে বা শূন্য দর দেখিয়ে নিজেদের কাগজে-কলমে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
এ ধরনের প্রক্রিয়া সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, মনিরুজ্জামান ঢালীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান অতীতে অনিয়মের অভিযোগে দুই বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এরপরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জয়পুরহাট, ভোলা, রাজবাড়ী ও জামালপুর সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব কাজে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক, হিসাবরক্ষক ও স্টোরকিপারদের কেউ কেউ জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও সরকারি তদন্ত প্রয়োজন।
এমদাদ হোসেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—মেসার্স তাহসিন এন্টারপ্রাইজ, দি প্রফেশনাল বিজনেস বিল্ডার্স এবং এএইচএস প্রেসটিজ ট্রেড।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নেত্রকোনা জেলা হাসপাতালের এমএসআর সামগ্রী কেনাকাটার টেন্ডারসহ মাগুরা, পটুয়াখালী, মেহেরপুর ও নড়াইলের বিভিন্ন হাসপাতালের কাজেও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ছিল।
এমদাদ হোসেনের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আগে থেকেই সমঝোতা থাকার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে অন্য দরদাতাদের কাজ পাওয়ার সুযোগ ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে তাহসিন এন্টারপ্রাইজের প্রকৃত মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে শেরেবাংলা নগর এলাকায় প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত মহব্বত আলী বর্তমানে ভারতে অবস্থান করলেও তার ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহযোগী এমদাদ হোসেনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই দাবির স্বাধীন যাচাইও প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যখাতে পরিবর্তন আনতে হলে শুধু সারপ্রাইজ ভিজিট বা আকস্মিক পরিদর্শন যথেষ্ট নয়—প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা, স্বচ্ছ পদায়ন এবং সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে এমএসআর সামগ্রী কেনাকাটায় একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করছে কি না, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী এবং অতীতে কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পুনরায় সরকারি কাজ পাচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি উঠেছে।
স্বাস্থ্যখাতের পুরোনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এবং নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে কি না—এসব প্রশ্নের জবাব এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছেই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।




















