হবিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) পদ শূন্য হয়ে পড়ায় নতুন পরিচালক নিয়োগ নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। এরই মধ্যে সাবেক পরিচালক মামুন কবীর তরফদারের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বন্দর ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ এবং নানা অভিযোগও সামনে এসেছে।
রোববার (২ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নূর-এ-আলম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেনকে বদলি করে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে নাটোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে উপপরিচালক (ডিডিএলজি) পদে পদায়ন করা হয়। গত বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে তিনি বেনাপোল বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
শামীম হোসেনের বদলির পর পরিচালক পদটি শূন্য হওয়ায় কে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসছেন—তা নিয়ে বন্দর এলাকায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক পরিচালক মামুন কবীর তরফদারকে পুনরায় বেনাপোল বন্দরে আনার জন্য একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত একটি সিন্ডিকেট তাকে পুনর্বহালের জন্য তদবির চালাচ্ছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত ছয় মাসে পণ্য চালান ঘাপলা, মিথ্যা ঘোষণা, ওজন কারচুপি, মালামাল লোপাটসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় ১৪০টিরও বেশি অভিযোগ ও মামলা হওয়ায় বন্দর ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে পরিচালক পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যদি কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত বা ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করতে হবে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠনের অভিযোগ, ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর বেনাপোল বন্দরে (ট্রাফিক) দায়িত্ব গ্রহণের পর মামুন কবীর তরফদারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তাদের দাবি, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম পরিচালনার সময় ক্রেন ও ফর্কলিফট পরিচালনাকারী ঠিকাদারদের সঙ্গে অনিয়ম, পণ্যবাহী ট্রেন থেকে অবৈধ অর্থ আদায়, রপ্তানিমুখী ট্রাকের সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণ এবং বিভিন্ন শেডে বহিরাগত লোক নিয়োগের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগে অতীতে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে দাবি করেন তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামুন কবীর তরফদারের বক্তব্য জানা যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও সম্ভব হয়নি।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের ভারত বলেন, একটি প্রভাবশালী মহল সাবেক পরিচালক মামুন কবীর তরফদারকে আবারও বেনাপোল বন্দরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তার দাবি, অতীতের বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছিল। এখন পুনরায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে বন্দরের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ শামছুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বেনাপোল স্থলবন্দরের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলপথে মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা জোরদার এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে একজন পূর্ণাঙ্গ ও দক্ষ পরিচালক নিয়োগের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বেনাপোল স্থলবন্দর। কিন্তু ব্যবসার পরিমাণ বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পর্যাপ্ত জনবল এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, দেশের ১৪টি স্থলবন্দরের মধ্যে বেনাপোলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অধিক বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে দেশের অধিকাংশ আমদানি-রপ্তানিকারক এই বন্দর ব্যবহার করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যানজট, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ অবস্থায় বন্দর সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিতর্কমুক্ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন পূর্ণকালীন পরিচালক দ্রুত নিয়োগ দিলে বেনাপোল বন্দরের কার্যক্রমে গতি ফিরবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়বে এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। পাশাপাশি নতুন পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।




















