০৮:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

১০৮ কোটি টাকার টেন্ডার কেলেঙ্কারিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমানুল্লাহ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৬:৪৫:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৬

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার দরপত্র অনুমোদনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, দরপত্রে যোগসাজশ (বিড রিগিং), বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনাকাটা এবং নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে ভিসির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম, প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডপ্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পরিকল্পিত বিড রিগিংয়ের ঘটনা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম এবং উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পারস্পরিক যোগসাজশে দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, লট-১-এ মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং লট-২-এ প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায় কার্যাদেশ পায়। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ নির্দেশনা অনুযায়ী, অ-উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন। ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সচিবের এবং ৫০ কোটির বেশি মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের এখতিয়ার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। কিন্তু এসব বিধান উপেক্ষা করে ভিসি নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস টেন্ডারিং পদ্ধতির নথি ব্যবহার করা হয়েছে। পরে চুক্তিতে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্টের উল্লেখ পাওয়া যায়। একই ক্রয় প্রক্রিয়ায় তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছে কমিশন।

এছাড়া দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি কারণে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তদন্তকারীরা এটিকেও পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতা সীমিত করার অংশ হিসেবে দেখছেন।

কমিশনের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, একটি লটে মাস্টার সিমেক্স সর্বনিম্ন দরদাতা এবং প্রিন্ট মাস্টার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও অন্য লটে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। এই বিন্যাসকে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের জবাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কারণে সরল বিশ্বাসে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না।

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় খাতে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া দুঃখজনক। তিনি বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এদিকে প্রতিযোগিতা কমিশন ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে সরকারি সব কেনাকাটা ই-জিপি ব্যবস্থায় সম্পন্ন করা, প্রতিযোগিতা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

ঝিকরগাছায় কথা কাটাকাটির জেরে দা দিয়ে কুপিয়ে ব্যক্তিকে গুরুতর জখম

১০৮ কোটি টাকার টেন্ডার কেলেঙ্কারিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আমানুল্লাহ

আপডেট: ০৬:৪৫:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার দরপত্র অনুমোদনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন, দরপত্রে যোগসাজশ (বিড রিগিং), বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনাকাটা এবং নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে ভিসির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম, প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডপ্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল পরিকল্পিত বিড রিগিংয়ের ঘটনা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম এবং উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। অভিযোগ ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পারস্পরিক যোগসাজশে দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালনা করেছে। তদন্তে দেখা যায়, লট-১-এ মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং লট-২-এ প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায় কার্যাদেশ পায়। ফলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ নির্দেশনা অনুযায়ী, অ-উন্নয়ন বাজেটের আওতায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন। ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট সচিবের এবং ৫০ কোটির বেশি মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের এখতিয়ার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। কিন্তু এসব বিধান উপেক্ষা করে ভিসি নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে ওপেন টেন্ডারিং মেথড (ওটিএম) উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস টেন্ডারিং পদ্ধতির নথি ব্যবহার করা হয়েছে। পরে চুক্তিতে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্টের উল্লেখ পাওয়া যায়। একই ক্রয় প্রক্রিয়ায় তিন ধরনের পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছে কমিশন।

এছাড়া দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি কারণে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তদন্তকারীরা এটিকেও পরিকল্পিতভাবে প্রতিযোগিতা সীমিত করার অংশ হিসেবে দেখছেন।

কমিশনের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, একটি লটে মাস্টার সিমেক্স সর্বনিম্ন দরদাতা এবং প্রিন্ট মাস্টার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও অন্য লটে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়। এই বিন্যাসকে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগের জবাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে, তারা নিয়ম মেনেই কাজ পেয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কারণে সরল বিশ্বাসে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না।

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রয় খাতে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া দুঃখজনক। তিনি বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এদিকে প্রতিযোগিতা কমিশন ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধে সরকারি সব কেনাকাটা ই-জিপি ব্যবস্থায় সম্পন্ন করা, প্রতিযোগিতা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।