১২:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের ২.৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:২৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫১১

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারি প্রাক্কলন উপেক্ষা করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মানে আপস এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ। অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় কমলনগরের নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ এবং একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য মোট ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়।

সরকারি প্রাক্কলনে ভবনের কলাম, টাইবিম, লিন্টেল ও ছাদের ঢালাইয়ের জন্য আধুনিক স্টিল সাটারিং ব্যবহারের নির্দেশনা ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য স্টিল সাটারিং বাবদ সাড়ে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে স্টিল সাটারিংয়ের পরিবর্তে পুরোনো বাঁশ, কাঠ ও জরাজীর্ণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কাগজে-কলমে স্টিল সাটারিং দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে সেই উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি। তাদের হিসাবে শুধু এই একটি খাত থেকেই প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় কীভাবে বিল পরিশোধ করা হলো এবং কোন ভিত্তিতে সন্তোষজনক কাজের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় চরজাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরজাঙ্গালিয়া খাসেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজিরহাট মিল্লাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ-পূর্ব চরকাদিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরকাদিরা কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর-পশ্চিম চরমার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব চরফলকন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রধান শিক্ষক বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে কাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না এবং প্রকৌশলীর তদারকিতেও ঘাটতি রয়েছে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরাও অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে অনিয়ম দেখা গেলেও স্থানীয়ভাবে জানানো সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিম্নমানের নির্মাণকাজ ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে গোফরান ট্রেডার্স ও ফয়সাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. গোফরান বলেন, তারা প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ করছেন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা অনুসরণ করেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।

উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে বলেন, কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে এবং ঠিকাদারকে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে। তবে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে, কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না কিংবা স্টিলের পরিবর্তে অন্য উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

এলজিইডির লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এলজিইডির নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মহসিন জানান, উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, “এ ভদ্রলোকের কারণে আমাদের এলজিইডি সেক্টরের দুর্নাম হচ্ছে।” পাশাপাশি নতুন এ অভিযোগও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুনরায় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

সর্বাধিক পঠিত

দেশনায়ক তারেক রহমানের ২৫ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বেনাপোল পৌর বিএনপির বৃক্ষরোপণ

বিশ্বব্যাংকের ২.৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট: ১০:২৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে সরকারি প্রাক্কলন উপেক্ষা করে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মানে আপস এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ। অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় কমলনগরের নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ এবং একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য মোট ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়।

সরকারি প্রাক্কলনে ভবনের কলাম, টাইবিম, লিন্টেল ও ছাদের ঢালাইয়ের জন্য আধুনিক স্টিল সাটারিং ব্যবহারের নির্দেশনা ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য স্টিল সাটারিং বাবদ সাড়ে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে স্টিল সাটারিংয়ের পরিবর্তে পুরোনো বাঁশ, কাঠ ও জরাজীর্ণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, কাগজে-কলমে স্টিল সাটারিং দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে সেই উপকরণ ব্যবহার করা হয়নি। তাদের হিসাবে শুধু এই একটি খাত থেকেই প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় কীভাবে বিল পরিশোধ করা হলো এবং কোন ভিত্তিতে সন্তোষজনক কাজের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় চরজাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরজাঙ্গালিয়া খাসেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মতিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজিরহাট মিল্লাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ-পূর্ব চরকাদিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চরকাদিরা কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর-পশ্চিম চরমার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব চরফলকন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রধান শিক্ষক বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে কাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না এবং প্রকৌশলীর তদারকিতেও ঘাটতি রয়েছে।

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরাও অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে অনিয়ম দেখা গেলেও স্থানীয়ভাবে জানানো সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নিম্নমানের নির্মাণকাজ ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অভিযোগের বিষয়ে গোফরান ট্রেডার্স ও ফয়সাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. গোফরান বলেন, তারা প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ করছেন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা অনুসরণ করেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।

উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করে বলেন, কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে এবং ঠিকাদারকে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে। তবে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে, কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না কিংবা স্টিলের পরিবর্তে অন্য উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

এলজিইডির লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে এলজিইডির নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মহসিন জানান, উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে।

তিনি বলেন, “এ ভদ্রলোকের কারণে আমাদের এলজিইডি সেক্টরের দুর্নাম হচ্ছে।” পাশাপাশি নতুন এ অভিযোগও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুনরায় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।