কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন-এ ঘটে গেছে হৃদয় কাঁপানো এক ঘটনা। তিতাস কমিউটার ট্রেনে উঠতে গিয়ে দুই বছরের শিশুসন্তানসহ প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের নিচে পড়ে যান এক নারী। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিলেও পিতার অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যায় বাবা ও ছেলে।মঙ্গলবার দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে ছেড়ে আসা তিতাস কমিউটার-এ ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভৈরব স্টেশনে এসেছিলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার এক দম্পতি। তাদের সঙ্গে ছিল দুই বছর বয়সী একমাত্র সন্তান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ট্রেনে ওঠার সময় ভারসাম্য হারিয়ে মা ও শিশুটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনের নিচে পড়ে যান। প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা বেশি হওয়ায় মা সহজে ওপরে উঠতে পারছিলেন না। অনেক চেষ্টার পর তিনি নিজে উঠে আসতে সক্ষম হলেও শিশুটিকে তুলতে পারেননি। ঠিক তখনই শিশুটি ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে আটকে পড়ে।
এরই মধ্যে ট্রেন ছাড়ার সংকেত বেজে ওঠে। সময় নষ্ট না করে শিশুটির বাবা দ্রুত নিচে নেমে যান। তিনি শিশুটিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ট্রেনের নিচে শুয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন চলতে শুরু করে। নিঃশ্বাসরুদ্ধকর সেই মুহূর্তে উপস্থিত সবাই আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যান। কেউ কেউ আল্লাহর নাম জপতে থাকেন।
ধীরে ধীরে ট্রেনটি অতিক্রম করার পর দেখা যায়, বাবা ও ছেলে দুজনই অক্ষত অবস্থায় রয়েছেন। এরপর বাবা সন্তানকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালে উপস্থিত জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। মা ছুটে এসে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেন। পুরো স্টেশনজুড়ে তখন আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, বাবা শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে একেবারে স্থির হয়ে শুয়ে আছেন। ট্রেন চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সামান্যও নড়াচড়া করেননি। তার এই সাহসিকতা ও পিতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ জানান, ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে স্টেশনে পৌঁছায়। দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিবারটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে।
ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাঈদ আহমেদ জানান, বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেলেও বাবা, মা ও শিশুর শরীরে কোনো আঘাত লাগেনি। সতর্কতামূলকভাবে তাদের হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা তা প্রয়োজন মনে করেননি। পরে ঢাকায় না গিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, সন্তানের বিপদে একজন বাবার সাহস, ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ কতটা অসীম হতে পারে। মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, দৃঢ়তা এবং সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই এ যাত্রায় একটি পরিবারকে ফিরিয়ে দিল নতুন জীবন।





















