চট্টগ্রাম ওয়াসার গাড়িচালক মো. তাজুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেককে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোরারম হোসেন।
আদালত তাজুল ইসলামকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই ধারায় তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমকেও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি খাইরুন্নেছাকে দুদক আইনের ২৬(২) ধারায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, তাজুল ইসলামের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ৩১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৬ টাকা। এর ৫০ শতাংশ হিসেবে তাঁকে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৩ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্ত্রীকেও একই পরিমাণ অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এর আগে মামলায় কারাভোগ করে থাকলে তা সাজা থেকে বাদ দেওয়া হবে।
আদালত ও দুদক সূত্রে জানা যায়, তাজুল ইসলাম ১৯৮৯ সালে মাসিক দুই হাজার টাকা বেতনে চট্টগ্রাম ওয়াসায় হেলপার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরে তিনি গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। চাকরিজীবনের একপর্যায়ে তাঁর মাসিক বেতন বেড়ে ৩৫ হাজার টাকায় দাঁড়ায়।
তবে তাঁর আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২২ সালের ৫ মার্চ তাজুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী খাইরুন্নেছা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালে তাজুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী চট্টগ্রাম নগরের রৌফাবাদ এলাকায় তিন শতক জমি কেনেন। ওই জমিতে নির্মাণ করা হয় পাঁচতলা একটি ভবন, যেখানে মোট ১৭টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভবনটির বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
দুদকের তদন্তে খাইরুন্নেছা বেগমের নামে জমি, ভবন এবং কয়েক কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। গৃহিণী হিসেবে তাঁর নিজস্ব আয়ের উৎস না থাকায় এসব সম্পদের বৈধ উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ভবনটির নির্মাণব্যয়ের অর্ধেক হিসেবে ২৫ লাখ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল। তবে গণপূর্ত বিভাগের তিন উপপ্রধান প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনটির পরিমাপ করানোর পর নির্মাণব্যয় ৩৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া খাইরুন্নেছার নামে ব্যাংকে জমা থাকা ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ অর্থসহ বিভিন্ন অস্থাবর সম্পদের তথ্যও তদন্তে উঠে আসে।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তাজুল ইসলামের আয়কে বৈধ হিসেবে দেখানোর জন্য তাঁর স্ত্রীকে পোলট্রি খামারের আয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত দেখানো হয়েছিল। তবে তদন্তে খাইরুন্নেছার স্বতন্ত্র কোনো আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি।
প্রায় তিন বছর তদন্তের পর গত বছরের শুরুতে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় দুদক। ২০২৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
অভিযোগ গঠনের নথি অনুযায়ী, তাজুল ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ৬৫৯ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, স্ত্রীর নামে জমি ও ভবনে বিনিয়োগ এবং দুদকে জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ১২ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
তাজুল ইসলাম চট্টগ্রাম ওয়াসা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।





















