বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোকে ঘিরে নানা প্রথা ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ও কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের বাহন এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর আগমন ও গমনের বাহনের ওপর নির্ভর করে আগামী দিনে পৃথিবীতে সুখ-সমৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক পরিস্থিতি কেমন থাকবে। ২০২৬ সালে দেবী দুর্গার আগমন হবে ঘোড়ায় এবং বিজয়া দশমীতে তাঁর প্রস্থান হবে নৌকায়।
পঞ্জিকা অনুসারে, দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে দেবীর মর্ত্যে আগমন এবং দশমীতে কৈলাসে প্রত্যাবর্তন হয়। এই দুই তিথি সপ্তাহের কোন বারে পড়ছে, তার ভিত্তিতেই প্রচলিত শাস্ত্রীয় নিয়মে দেবীর বাহন নির্ধারণ করা হয়।
* রবিবার ও সোমবার: দেবীর বাহন গজ বা হাতি।
* শনিবার ও মঙ্গলবার: দেবীর বাহন ঘোটক বা ঘোড়া।
* বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার: দেবীর বাহন দোলা বা পালকি।
* বুধবার: দেবীর বাহন নৌকা।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, আগমন ও প্রস্থানের বাহন একই হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বরং সপ্তাহের বার অনুযায়ী দুই ক্ষেত্রেই আলাদাভাবে বাহন নির্ধারিত হয়।
লোকবিশ্বাস ও প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দেবী দুর্গা ঘোড়ায় আগমন বা গমন করলে তার ফল হিসেবে বলা হয় ‘ছত্রভঙ্গ স্তুরঙ্গমে’। এই বিশ্বাস অনুসারে, ঘোড়া অস্থিরতা ও সংঘাতের প্রতীক। ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা বৃদ্ধি, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সংঘাত এবং যুদ্ধের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে এগুলি ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রথাগত ব্যাখ্যার অংশ, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়।
প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় নৌকায় দেবীর আগমন বা গমনকে ‘শস্যবৃদ্ধিস্তথা জলম’ বলে উল্লেখ করা হয়। এই বিশ্বাস অনুযায়ী, নৌকা শস্যবৃদ্ধি ও মনোবাঞ্ছা পূরণের ইঙ্গিত বহন করে। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি, বন্যা কিংবা প্লাবনের আশঙ্কার কথাও বলা হয়।
অর্থাৎ, নৌকায় দেবীর গমনকে একদিকে শস্যসমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও অন্যদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কার সঙ্গেও যুক্ত করা হয়।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গার বাহন হাতি হলে তা অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচিত হয়। হাতিতে আগমন বা গমন হলে সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং কৃষিকাজে উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে মনে করা হয়।
অন্যদিকে, দোলা বা পালকিতে দেবীর আগমন কিংবা প্রস্থানকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। প্রচলিত শাস্ত্রীয় প্রবচন ‘দোলায়াং মকরং ভবেৎ’-এর সঙ্গে মহামারি, খরা, ভূমিকম্প, যুদ্ধ ও প্রাণহানির আশঙ্কার কথা যুক্ত রয়েছে।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজোর নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, মহালয়া পালিত হবে ১০ অক্টোবর। দুর্গাপুজোর সপ্তমী তিথি ১৭ ও ১৮ অক্টোবর—দুই দিন ধরে থাকলেও প্রচলিত নিয়মে প্রথম সপ্তমী, অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর শনিবারকে দেবীর আগমনের দিন হিসেবে ধরা হচ্ছে। শনিবার হওয়ায় দেবীর আগমনের বাহন ঘোড়া।
অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর বুধবার পালিত হবে বিজয়া দশমী। বুধবারের নিয়ম অনুযায়ী, দেবী দুর্গা নৌকায় চড়ে কৈলাসে ফিরে যাবেন।
ফলে ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় প্রচলিত শাস্ত্রীয় হিসাব অনুসারে দেবীর ঘোড়ায় আগমন ও নৌকায় গমন নির্ধারিত হয়েছে। এই দুই বাহনকে ঘিরে প্রচলিত বিশ্বাসে যেমন অস্থিরতার আশঙ্কার কথা রয়েছে, তেমনই শস্যবৃদ্ধি ও জলসম্পদের সমৃদ্ধির ইঙ্গিতও পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, দেবীর বাহন ও তার ফলাফল সম্পর্কিত ব্যাখ্যাগুলি হিন্দু ধর্মীয় প্রথা ও লোকবিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রচলিত। এগুলিকে ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।




















