সাবেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা সাঈদ খোকন এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের আয়, সম্পদ ও ব্যাংক লেনদেনে বড় ধরনের অসংগতি পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট—এমন তথ্য উঠে এসেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত সাঈদ খোকন, তাঁর মা, স্ত্রী, বোন ও সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রায় ২ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। একই সময়ে অপ্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ১২৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং কর ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২৯৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, সাঈদ খোকনের অপ্রদর্শিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯৮৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রী ফারহানা সাঈদের প্রায় ৫৩০ কোটি ৯০ লাখ, মা ফাতেমা খাতুনের ২৩১ কোটি ৯২ লাখ এবং বোন শাহানা হানিফের প্রায় ১৫০ কোটি ২৬ লাখ টাকার অপ্রদর্শিত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামেও বিপুল অপ্রদর্শিত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজ লিমিটেডে ৫০৫ কোটি, আরা হস্পিটালিটি সার্ভিসেস লিমিটেডে ২৬৩ কোটি এবং ফোরএ প্রাইভেট লিমিটেডে ৪৫৭ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থের কথা বলা হয়েছে।
আয়কর গোয়েন্দার অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা যায়, সাঈদ খোকন ও তাঁর পরিবারের ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত আয়, স্থায়ী আমানত, ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ ও সম্পদ বিবরণীর মধ্যে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে।
তিনটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিদেশে অর্থপাচারের সম্ভাব্য সংযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজধানীর বনানীতে ‘সাঈদ খোকন অটোগ্রাফ’ নামে ১৯ তলা একটি বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও অসংগতি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২০২৩-২৪ করবর্ষে ভবনটিতে প্রায় ৫১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ দেখানো হলেও গণপূর্ত বিভাগের মূল্যায়নে নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১১০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এতে প্রায় ৫৯ কোটি ৯ লাখ টাকার পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গুলশান-২-এর একটি ১৪ তলা বাণিজ্যিক ভবনের বিনিয়োগ ও প্রকৌশল বিভাগের মূল্যায়িত নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যেও প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ টাকার পার্থক্যের তথ্য পাওয়া গেছে।
ট্রেজারি বিল-বন্ডে বড় বিনিয়োগ
অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে সাঈদ খোকনের নামে বিপুল অঙ্কের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত একাধিক ট্রেজারি বিল নগদায়নের পাশাপাশি কয়েকটি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগের তথ্যও রয়েছে।
তবে এসব বিনিয়োগের সব তথ্য আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি বলে আয়কর গোয়েন্দার অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যদের সম্পদ নিয়েও অনুসন্ধান
সাঈদ খোকনের স্ত্রী, মা ও বোনের আয় ও সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অসংগতির তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করেছে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট।
স্ত্রীর ক্ষেত্রে ব্যাংক স্থিতি, ডিভিডেন্ড, সুদ ও বিভিন্ন বিনিয়োগের তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। মায়ের ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ড, সুদ, শেয়ারবাজার ও বন্ডে বিনিয়োগের তথ্য গোপনের কথা বলা হয়েছে। বোনের ক্ষেত্রেও ব্যাংক হিসাব, বন্ড ও বিভিন্ন বিনিয়োগের তথ্য আয়কর নথিতে যথাযথভাবে প্রদর্শন না করার অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের তিন মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর ফাঁকির অভিযোগ প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা
অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাঈদ খোকন, তাঁর পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মোট প্রায় ২৯৬ কোটি ৮৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা কর ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে সাঈদ খোকনের প্রায় ৯৪ কোটি ২০ লাখ, তাঁর স্ত্রীর ৪৯ কোটি ৯৫ লাখ, মায়ের ৪০ কোটি ৮৯ লাখ, বোনের ১৮ কোটি ৮০ লাখ, সাঈদ খোকন প্রোপার্টিজের ৭৩ কোটি ৩২ লাখ এবং আরা হস্পিটালিটির প্রায় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা কর ফাঁকির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
কালোটাকা সাদা করার তথ্য
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে সাঈদ খোকন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তৎকালীন প্রচলিত ব্যবস্থায় অর্থ প্রদানের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ দেখানোর সুযোগ নিয়েছিলেন।
২০২০-২১ করবর্ষে সাঈদ খোকন ও তাঁর মা পৃথকভাবে অর্থ জমা দিয়ে বড় অঙ্কের টাকা বৈধ দেখিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী করবর্ষে তাঁর স্ত্রীও একই ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কর বিশেষজ্ঞরা বলেন, আয় ও সম্পদের মধ্যে অসংগতি এবং ব্যাংক লেনদেন বিশ্লেষণ করলে অর্থের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাঈদ খোকন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন আদালত। ওই আবেদনে অস্বাভাবিক ব্যাংক লেনদেন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দেশে-বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে বর্তমান প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সাঈদ খোকন বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




















