১১:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

পিরোজপুরে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ, কাগজে কাজ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা পরিশোধ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:১৩:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৫০৪

পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে রাস্তা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ না করেই কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আবার বাস্তবে থাকা স্থাপনাকেও নথিতে ‘নেই’ দেখিয়ে একই স্থানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এলজিইডির নথি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পিরোজপুর জেলায় বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্পের কাজ, অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়নের হিসাব নিয়ে তদন্তে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কিছু প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে পরিশোধিত বিলের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কোথাও কাজ শুরু না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়ন দেওয়া হলেও সরেজমিনে গিয়ে প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পে গুরুতর অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে আড়াগুলগড়—পূর্ব শিয়ালকাঠী থেকে মলিয়ার হাট ডিস্ট্রিক্ট রোডে একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়নও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরেজমিন পরিদর্শনে সেখানে কোনো নির্মাণকাজ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল।

একইভাবে ভাণ্ডারিয়া-চরখালী সড়কের একটি অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ দেখিয়ে ৮২ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে সরেজমিনে ওই কাজের অস্তিত্ব না পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাণ্ডারিয়া পূর্ব দাওয়া রোডে ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের মাত্র ১৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হলেও সরেজমিনে কোনো সেতু নির্মাণের কাজ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়কের একটি অংশে দুই কিলোমিটারের বেশি বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ৯৫ শতাংশ অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সরেজমিন পরিদর্শনে ওই কাজের বাস্তবায়ন পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে একই সড়ককে কেন্দ্র করে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

বরিশাল বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়ক থেকে তালুকদার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হয়। এর আগের একটি প্রকল্পের আওতায় একই সড়কে চারটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পিরোজপুরের কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

‘দক্ষিণাঞ্চলের জেলার সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে’ পিরোজপুরে ৬৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেলেও বাকি ২১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার কাজের সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

‘পিরোজপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ তিন বছরে ৬২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘বরিশাল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে’ পিরোজপুর জেলায় ৩৬০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও মাত্র ১০১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ‘সার্বভৌম মূল্যায়ন ও কন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ২৭৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৭১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাজের হিসাব, ‘উপজেলা টাউন (নন-পৌরসভা) মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন এবং মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২১ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

‘গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ ৭১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে। ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ প্রকল্পে’ ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ছাড় হলেও হিসাব পাওয়া গেছে ৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকার।

অন্যদিকে ‘বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ‘দেশব্যাপী পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পে’ ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে বিভিন্ন প্রকল্পের বিল-ভাউচার এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রকল্পের ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

এ ছাড়া বই, বিল রেজিস্টার, চেক রেজিস্টার, অর্থ ছাড়ের পত্র (ডিও), পরিমাপ বই, ব্যাংক চালান ও ব্যাংক হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ নথির ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগও রয়েছে। ২২৫টি প্যাকেজের মধ্যে ১২টির কাজ শুরুই হয়নি এবং ১২১টি প্যাকেজের কাজ চলমান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অর্থ ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে।

সচিবালয়ে আগুন লাগার পর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে পিরোজপুরের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ লুটপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাবেক মুখ্য সচিবের প্রাথমিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়।

এরপর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্ত করা হয়।

এলজিইডির পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, প্রকল্প পরিচালক মূলত বিল পরিশোধ করেন এবং অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর। তাই এসব অনিয়মের দায় তাঁর নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) গোলাম কৃপা দেওয়ান কাদের বলেন, পিরোজপুরের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও পৃথক তদন্ত করেছে।

তিনি বলেন, “এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।”

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিরোজপুরে অনিয়মের বিষয়টি এলজিইডি আগে জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করা হয়েছে।

পিরোজপুর এলজিইডির এসব প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কত টাকার কাজ বাস্তবে হয়েছে এবং কত টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, দরপত্র নথি, কাজের পরিমাপ ও সরেজমিন বাস্তবায়ন যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তাদের মতে, কাগজপত্রের হিসাবের পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন করে কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

সর্বাধিক পঠিত

ঝিকরগাছায় ১৭ কোটি টাকার কথিত প্লাটিনামের প্রলোভনে ৬৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ, আটক ১

পিরোজপুরে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ, কাগজে কাজ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা পরিশোধ

আপডেট: ১২:১৩:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে রাস্তা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ না করেই কাগজপত্রে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আবার বাস্তবে থাকা স্থাপনাকেও নথিতে ‘নেই’ দেখিয়ে একই স্থানে নতুন প্রকল্প নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এলজিইডির নথি ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পিরোজপুর জেলায় বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্পের কাজ, অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়নের হিসাব নিয়ে তদন্তে একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কিছু প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের সঙ্গে পরিশোধিত বিলের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কোথাও কাজ শুরু না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়ন দেওয়া হলেও সরেজমিনে গিয়ে প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পে গুরুতর অসঙ্গতির তথ্য উঠে এসেছে।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা থেকে আড়াগুলগড়—পূর্ব শিয়ালকাঠী থেকে মলিয়ার হাট ডিস্ট্রিক্ট রোডে একটি কালভার্ট নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যয়নও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরেজমিন পরিদর্শনে সেখানে কোনো নির্মাণকাজ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছিল।

একইভাবে ভাণ্ডারিয়া-চরখালী সড়কের একটি অংশে মাটি ভরাটের কাজ শেষ দেখিয়ে ৮২ শতাংশ অর্থ তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে সরেজমিনে ওই কাজের অস্তিত্ব না পাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ভাণ্ডারিয়া পূর্ব দাওয়া রোডে ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের মাত্র ১৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ৮০ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হলেও সরেজমিনে কোনো সেতু নির্মাণের কাজ পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়কের একটি অংশে দুই কিলোমিটারের বেশি বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ৯৫ শতাংশ অর্থও পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সরেজমিন পরিদর্শনে ওই কাজের বাস্তবায়ন পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে একই সড়ককে কেন্দ্র করে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

বরিশাল বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চরখালী-ভাণ্ডারিয়া সড়ক থেকে তালুকদার বাড়ি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের কাজ ২০১৯ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হয়। এর আগের একটি প্রকল্পের আওতায় একই সড়কে চারটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পিরোজপুরের কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

‘দক্ষিণাঞ্চলের জেলার সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে’ পিরোজপুরে ৬৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেলেও বাকি ২১৫ কোটি ৭১ লাখ টাকার কাজের সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

‘পিরোজপুর জেলা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ তিন বছরে ৬২০ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১১ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

‘বরিশাল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে’ পিরোজপুর জেলায় ৩৬০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য থাকলেও মাত্র ১০১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া ‘সার্বভৌম মূল্যায়ন ও কন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ২৭৭ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৭১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাজের হিসাব, ‘উপজেলা টাউন (নন-পৌরসভা) মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন এবং মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২১ কোটি ২২ লাখ টাকার মধ্যে ১০ কোটি ৩০ লাখ টাকার ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

‘গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ ৭১ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার কাজের হিসাব পাওয়া গেছে। ‘উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়কে ১০০ মিটারের কম দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ প্রকল্পে’ ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা ছাড় হলেও হিসাব পাওয়া গেছে ৫৩ কোটি ১১ লাখ টাকার।

অন্যদিকে ‘বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে’ ১৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ‘দেশব্যাপী পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পে’ ১৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৩১ লাখ টাকার হিসাব পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিরোজপুরে বিভিন্ন প্রকল্পের বিল-ভাউচার এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রকল্পের ছাড়পত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।

এ ছাড়া বই, বিল রেজিস্টার, চেক রেজিস্টার, অর্থ ছাড়ের পত্র (ডিও), পরিমাপ বই, ব্যাংক চালান ও ব্যাংক হিসাবসহ গুরুত্বপূর্ণ নথির ঘাটতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও অর্থ ছাড়ের অভিযোগও রয়েছে। ২২৫টি প্যাকেজের মধ্যে ১২টির কাজ শুরুই হয়নি এবং ১২১টি প্যাকেজের কাজ চলমান থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বিপরীতে অর্থ ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে।

সচিবালয়ে আগুন লাগার পর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়টি আলোচনায় আসে। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে পিরোজপুরের বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ লুটপাটের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সাবেক মুখ্য সচিবের প্রাথমিক সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়।

এরপর পিরোজপুর এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় তদন্ত শুরু করে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও পৃথক তদন্ত করা হয়।

এলজিইডির পরিচালক আহসান হাবিব বলেন, প্রকল্প পরিচালক মূলত বিল পরিশোধ করেন এবং অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর। তাই এসব অনিয়মের দায় তাঁর নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) গোলাম কৃপা দেওয়ান কাদের বলেন, পিরোজপুরের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ও পৃথক তদন্ত করেছে।

তিনি বলেন, “এলজিইডির তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।”

দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পিরোজপুরে অনিয়মের বিষয়টি এলজিইডি আগে জানতে পারে এবং সে অনুযায়ী তদন্ত করা হয়েছে।

পিরোজপুর এলজিইডির এসব প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কত টাকার কাজ বাস্তবে হয়েছে এবং কত টাকা অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, দরপত্র নথি, কাজের পরিমাপ ও সরেজমিন বাস্তবায়ন যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তাদের মতে, কাগজপত্রের হিসাবের পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন করে কাজের বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।