১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

ডিএসসিসির কমিউনিটি সেন্টারে ২৩ অনুষ্ঠান, হিসাব নেই ১১ লাখ টাকার

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:২৬:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫১১

হল ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানও হয়েছে। অতিথিরা এসেছেন, আয়োজন শেষে চলে গেছেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের কোনো হিসাবই ওঠেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খাতায়। একটি-দুটি নয়, চার মাসে এভাবে ২৩টি অনুষ্ঠান হয়েছে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে।

অভিযোগ উঠেছে, এসব অনুষ্ঠান থেকে আদায় করা টাকা করপোরেশনের তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের তীর কেন্দ্রটির তদারকির সঙ্গে যুক্ত সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান এবং তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনের দিকে। তবে ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ নথিতে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে পদবি ধরে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং গায়েব হওয়া অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতে যাতে না হয়, সে জন্য অনলাইনে বুকিং পদ্ধতি শিগগিরই চালু করা হবে।’

দুই খাতার হিসাবেই ধরা পড়ে গরমিল

ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে ১৩১টি অনুষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এসব অনুষ্ঠান থেকে ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ টাকা জমা দেওয়ার হিসাবও রয়েছে।

কিন্তু ডেকোরেটর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার যাচাই করে একই সময়ে আরও ২৩টি অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব অনুষ্ঠানের কোনো উল্লেখ কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে নেই।

দুই খাতার তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, ওই চার মাসে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে অন্তত ১৫৪টি অনুষ্ঠান হয়েছে। করপোরেশনের হিসাবে রয়েছে ১৩১টি। বাকি ২৩টি অনুষ্ঠান হয়েছে ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বিভিন্ন দিনে। কোনোটি দিনে, কোনোটি রাতে। ব্যবহার করা হয়েছে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা।

এমনকি একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্যও ডেকোরেটরের রেজিস্টারে রয়েছে, যেগুলোর কোনোটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির হিসাবের খাতায় নেই।

২৩ অনুষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা

প্রশ্ন উঠেছে, অনুষ্ঠানগুলো বাস্তবে হওয়ার পরও সেগুলোর ভাড়া গেল কোথায়। সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র বিনা মূল্যে ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। হলভাড়ার পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, পানি ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতেও টাকা দিতে হয়।

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে হলভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, শীতাতপনিয়ন্ত্রণের বিল, পানির বিল ও ভ্যাটসহ পুরো টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। সূত্রের দাবি, ওই ২৩টি অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল। তবে সেই অর্থের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সাইদুর রহমান নিজেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। সেই প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

তবে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের একটি সূত্রের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের কিছু অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের টাকা আদায় করা যায়নি।

অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, করপোরেশনের একটি পক্ষ বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে একটি ‘ফাঁদ’ পেতেছে। সেই ফাঁদে কিছু কর্মকর্তা আটকে গেছেন।

বক্তব্য দিতে রাজি নন অভিযুক্তরা

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে কথা বলবেন বলে জানান। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনও অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় শুধু গায়েব হওয়া টাকা আদায়ের সুপারিশই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে তাঁদের সাময়িক বরখাস্তের কথাও বলা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, চার মাসে ২৩টি অনুষ্ঠানের হিসাব কীভাবে করপোরেশনের মূল রেজিস্টারের বাইরে থাকল এবং এসব অনুষ্ঠান থেকে আদায় করা অর্থ কোথায় গেল। তদন্ত ও বিভাগীয় কার্যক্রমেই এর চূড়ান্ত জবাব মিলবে।

সর্বাধিক পঠিত

শার্শা সীমান্তে অভিযানে ২৬ বোতল এস্কাফ সিরাপসহ মাদক কারবারি আটক

ডিএসসিসির কমিউনিটি সেন্টারে ২৩ অনুষ্ঠান, হিসাব নেই ১১ লাখ টাকার

আপডেট: ০৯:২৬:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

হল ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানও হয়েছে। অতিথিরা এসেছেন, আয়োজন শেষে চলে গেছেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানের কোনো হিসাবই ওঠেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) খাতায়। একটি-দুটি নয়, চার মাসে এভাবে ২৩টি অনুষ্ঠান হয়েছে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে।

অভিযোগ উঠেছে, এসব অনুষ্ঠান থেকে আদায় করা টাকা করপোরেশনের তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের তীর কেন্দ্রটির তদারকির সঙ্গে যুক্ত সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান এবং তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনের দিকে। তবে ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ নথিতে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে পদবি ধরে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং গায়েব হওয়া অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পাশাপাশি এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতে যাতে না হয়, সে জন্য অনলাইনে বুকিং পদ্ধতি শিগগিরই চালু করা হবে।’

দুই খাতার হিসাবেই ধরা পড়ে গরমিল

ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে ১৩১টি অনুষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এসব অনুষ্ঠান থেকে ৩৬ লাখ ৮০ হাজার ৯০০ টাকা জমা দেওয়ার হিসাবও রয়েছে।

কিন্তু ডেকোরেটর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার যাচাই করে একই সময়ে আরও ২৩টি অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এসব অনুষ্ঠানের কোনো উল্লেখ কেয়ারটেকারের রেজিস্টারে নেই।

দুই খাতার তথ্য মিলিয়ে দেখা যায়, ওই চার মাসে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রে অন্তত ১৫৪টি অনুষ্ঠান হয়েছে। করপোরেশনের হিসাবে রয়েছে ১৩১টি। বাকি ২৩টি অনুষ্ঠান হয়েছে ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বিভিন্ন দিনে। কোনোটি দিনে, কোনোটি রাতে। ব্যবহার করা হয়েছে নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা।

এমনকি একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠান হওয়ার তথ্যও ডেকোরেটরের রেজিস্টারে রয়েছে, যেগুলোর কোনোটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির হিসাবের খাতায় নেই।

২৩ অনুষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা

প্রশ্ন উঠেছে, অনুষ্ঠানগুলো বাস্তবে হওয়ার পরও সেগুলোর ভাড়া গেল কোথায়। সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র বিনা মূল্যে ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। হলভাড়ার পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, পানি ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন খাতেও টাকা দিতে হয়।

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে হলভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, শীতাতপনিয়ন্ত্রণের বিল, পানির বিল ও ভ্যাটসহ পুরো টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে। সূত্রের দাবি, ওই ২৩টি অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল। তবে সেই অর্থের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে সাইদুর রহমান নিজেকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। সেই প্রভাবের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

তবে গেন্ডারিয়া সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের একটি সূত্রের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের কিছু অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের টাকা আদায় করা যায়নি।

অন্যদিকে আরেকটি সূত্রের দাবি, করপোরেশনের একটি পক্ষ বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে একটি ‘ফাঁদ’ পেতেছে। সেই ফাঁদে কিছু কর্মকর্তা আটকে গেছেন।

বক্তব্য দিতে রাজি নন অভিযুক্তরা

অভিযোগের বিষয়ে সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা সাইদুর রহমানের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়ি থেকে নেমে কথা বলবেন বলে জানান। পরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তত্ত্বাবধায়ক অমরেশ মন্ডল রতনও অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

ডিএসসিসির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় শুধু গায়েব হওয়া টাকা আদায়ের সুপারিশই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, সহকারী সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে তাঁদের সাময়িক বরখাস্তের কথাও বলা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, চার মাসে ২৩টি অনুষ্ঠানের হিসাব কীভাবে করপোরেশনের মূল রেজিস্টারের বাইরে থাকল এবং এসব অনুষ্ঠান থেকে আদায় করা অর্থ কোথায় গেল। তদন্ত ও বিভাগীয় কার্যক্রমেই এর চূড়ান্ত জবাব মিলবে।