১১:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

মাদারীপুর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৯:২৩:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৮

মাদারীপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন। নবম গ্রেডের এই কর্মকর্তার মাসিক বেতন ও ভাতা মিলিয়ে আয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। অথচ অভিযোগ উঠেছে, এই আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে নিজের, স্ত্রী ও শ্যালকের নামে কেনা জমি ও ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৫৯ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

হেলাল উদ্দিনের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরে। তার স্ত্রী শাহিনা পারভীনও একই জেলার বাসিন্দা। বর্তমানে তারা রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করেন। পৈতৃক সূত্রে তাদের এলাকায় ১০৪ শতাংশ জমি রয়েছে বলেও জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হেলাল উদ্দিনের সম্পদের বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত থাকাকালে। দীর্ঘদিন সেখানে দায়িত্ব পালনের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর তাকে মাদারীপুরে বদলি করা হয়। জমি ও ফ্ল্যাট কেনার পাশাপাশি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঢাকার ছয় এলাকায় ৩৩.৮৯ শতাংশ জমি

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হেলাল উদ্দিন, তার স্ত্রী ও শ্যালকের নামে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোট ৩৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে নিজের নামে গুলশান, মোহাম্মদপুর ও বাড্ডায় ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ জমি। স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে ধানমন্ডিতে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে স্ত্রী ও শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে রয়েছে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি।

গুলশান-ভাটারা এলাকার ১৫ নম্বর মৌজায় ১৮৯৪৪ নম্বর খতিয়ানে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আবাসিক জমি নিজের নামে কিনেছেন হেলাল উদ্দিন। অভিজাত এই এলাকায় জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া বাড্ডায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং মোহাম্মদপুরে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে তার নামে। এ দুই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

ধানমন্ডির রামচন্দ্রপুর-১ মৌজায় ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ জমি স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে কেনা হয়েছে। ওই জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

তেজগাঁওয়ের গজারিয়া-১ মৌজায় স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে সাড়ে ৭ শতাংশ জমি রয়েছে হেলাল উদ্দিনের। এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের তারানগর মৌজায় শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে রয়েছে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।

জমির পাশাপাশি রয়েছে ফ্ল্যাট ও দোকান

জমির পাশাপাশি রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটির ১০ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাটও হেলাল উদ্দিনের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট এবং একাধিক মার্কেটে দোকান থাকার অভিযোগও রয়েছে।

সাত ব্যাংক ও ১০ মোবাইল অ্যাকাউন্টে লেনদেন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেলাল উদ্দিন ও তার পরিবারের নামে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। নিজের নামে ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকে পাঁচটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে রয়েছে পূবালী ব্যাংকের দুটি এবং আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডে একটি অ্যাকাউন্ট।

এ ছাড়া নগদ ও বিকাশের অন্তত ১০টি নম্বর ব্যবহার করে লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।

‘ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই’

নবম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি হেলাল উদ্দিন। সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তিনি বলেন, ‘মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া কথা বলা মানা। ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই। যা আছে, তার ভ্যাট-ট্যাক্স সবই আছে। এর বাইরে কেউ কোনো সম্পদের বিষয়ে বললে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

তদন্তের কথা বলছে অধিদপ্তর

বিষয়টি নিয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। লিখিতভাবে আবেদন করতে বলা হলে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি লিখিত আবেদন করা হয়। ২ মার্চ লিখিত জবাবে তিনি বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।

অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মহাপরিচালক কথা না বললেও যেহেতু অভিযোগ এসেছে, অধিদপ্তর অবশ্যই তদন্ত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।

সর্বাধিক পঠিত

শার্শা সীমান্তে অভিযানে ২৬ বোতল এস্কাফ সিরাপসহ মাদক কারবারি আটক

মাদারীপুর পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক হেলাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

আপডেট: ০৯:২৩:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

মাদারীপুর জেলা পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. হেলাল উদ্দিন। নবম গ্রেডের এই কর্মকর্তার মাসিক বেতন ও ভাতা মিলিয়ে আয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। অথচ অভিযোগ উঠেছে, এই আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদের পাহাড়। রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে নিজের, স্ত্রী ও শ্যালকের নামে কেনা জমি ও ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৫৯ কোটি টাকা বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

হেলাল উদ্দিনের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার ভাষানচরে। তার স্ত্রী শাহিনা পারভীনও একই জেলার বাসিন্দা। বর্তমানে তারা রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটিতে বসবাস করেন। পৈতৃক সূত্রে তাদের এলাকায় ১০৪ শতাংশ জমি রয়েছে বলেও জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হেলাল উদ্দিনের সম্পদের বড় একটি অংশ গড়ে ওঠে রাজধানীর আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত থাকাকালে। দীর্ঘদিন সেখানে দায়িত্ব পালনের পর গত বছরের ২৮ অক্টোবর তাকে মাদারীপুরে বদলি করা হয়। জমি ও ফ্ল্যাট কেনার পাশাপাশি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।

ঢাকার ছয় এলাকায় ৩৩.৮৯ শতাংশ জমি

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হেলাল উদ্দিন, তার স্ত্রী ও শ্যালকের নামে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় মোট ৩৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে নিজের নামে গুলশান, মোহাম্মদপুর ও বাড্ডায় ১৫ দশমিক ৪২ শতাংশ জমি। স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে ধানমন্ডিতে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং তেজগাঁও ও কেরানীগঞ্জে স্ত্রী ও শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে রয়েছে ১২ দশমিক ৯৫ শতাংশ জমি।

গুলশান-ভাটারা এলাকার ১৫ নম্বর মৌজায় ১৮৯৪৪ নম্বর খতিয়ানে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আবাসিক জমি নিজের নামে কিনেছেন হেলাল উদ্দিন। অভিজাত এই এলাকায় জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া বাড্ডায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং মোহাম্মদপুরে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ জমি রয়েছে তার নামে। এ দুই জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৭ কোটি টাকা।

ধানমন্ডির রামচন্দ্রপুর-১ মৌজায় ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ জমি স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে কেনা হয়েছে। ওই জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

তেজগাঁওয়ের গজারিয়া-১ মৌজায় স্ত্রীর সঙ্গে যৌথভাবে সাড়ে ৭ শতাংশ জমি রয়েছে হেলাল উদ্দিনের। এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের তারানগর মৌজায় শ্যালক হাসিবুল ইসলামের সঙ্গে যৌথ নামে রয়েছে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।

জমির পাশাপাশি রয়েছে ফ্ল্যাট ও দোকান

জমির পাশাপাশি রাজধানীর আদাবরের ইবনে সিনা হাউজিং সোসাইটির ১০ নম্বর সড়কের একটি ফ্ল্যাটও হেলাল উদ্দিনের পরিবারের মালিকানায় রয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য এক কোটি টাকার বেশি বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ফ্ল্যাট এবং একাধিক মার্কেটে দোকান থাকার অভিযোগও রয়েছে।

সাত ব্যাংক ও ১০ মোবাইল অ্যাকাউন্টে লেনদেন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেলাল উদ্দিন ও তার পরিবারের নামে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। নিজের নামে ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকে পাঁচটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। স্ত্রী শাহিনা পারভীনের নামে রয়েছে পূবালী ব্যাংকের দুটি এবং আইডিএলসি ফিন্যান্স লিমিটেডে একটি অ্যাকাউন্ট।

এ ছাড়া নগদ ও বিকাশের অন্তত ১০টি নম্বর ব্যবহার করে লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।

‘ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই’

নবম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি হেলাল উদ্দিন। সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তিনি বলেন, ‘মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া কথা বলা মানা। ঢাকা শহরে আমার এত টাকা নেই। যা আছে, তার ভ্যাট-ট্যাক্স সবই আছে। এর বাইরে কেউ কোনো সম্পদের বিষয়ে বললে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

তদন্তের কথা বলছে অধিদপ্তর

বিষয়টি নিয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি বক্তব্য দিতে রাজি হননি। লিখিতভাবে আবেদন করতে বলা হলে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি লিখিত আবেদন করা হয়। ২ মার্চ লিখিত জবাবে তিনি বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।

অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মহাপরিচালক কথা না বললেও যেহেতু অভিযোগ এসেছে, অধিদপ্তর অবশ্যই তদন্ত করবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের উৎস সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।