০৬:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

বেনাপোল বন্দরে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য গায়েব: মূলহোতা মাহিদুলসহ সিন্ডিকেট অধরা

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৬:৩০:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৮

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা ঘটেছে। বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ৬ কোটি টাকা মূল্যের জব্দকৃত উচ্চ শুল্কযুক্ত ভারতীয় পণ্য রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে। মূল্যবান পণ্যের পরিবর্তে সেখানে রাখা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি ও থ্রিপিস। এই গুরুতর অনিয়মের ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করলেও, মূল অভিযুক্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাহিদুল ইসলামকে রাখা হয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে একটি পণ্য চালান জব্দ করা হয়। চালানটি যেন কোনোভাবেই হাতবদল না হয়, সেজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল এবং ২০ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তিনটি আলাদা চিঠিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানায়। কিন্তু কোরবানির ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে বন্দরের তালাবদ্ধ শেড থেকে জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে ২ জুন কায়িক পরীক্ষায় পণ্য পরিবর্তনের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর গত ৯ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে ১০ জনের নামে মামলা দায়ের করে (মামলা নং-০৯, কাস্টমস আইন ২০২৩)। অথচ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল কারিগর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামকে মামলার আসামি করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বন্দর এলাকায় গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন এই মাহিদুল। তার সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু পরিচয়দানকারী বগুড়ার হিরু, অস্ত্র ব্যবসায়ী আজিম, সামাদ, ডাব্লু, রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ার এবং মনির। এছাড়া, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম-১ ও বন্দরের আশিকুর রহমান রনি যোগসাজশে ওজনে কারচুপি ও জাল নথিপত্র তৈরি করে পণ্য খালাসে সক্রিয় রয়েছেন। রিয়াদ এজেন্সির কর্মচারী রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ারের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে এ রফাদফা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি শেড ইনচার্জ, ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তবে কাস্টমস কর্মকর্তা মাহিদুল কেন মামলার বাইরে থাকবে? স্থানীয়দের অভিযোগ, কাস্টমস কমিশনারের গোপন আঁতাত ও প্রশ্রয় ছাড়া বন্দরে এমন ভয়াবহ অপরাধ চালানো অসম্ভব। এ ধরণের অবৈধ লেনদেনের টাকা ঢাকায় কমিশনারের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পৌঁছানো হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তবে ৩৭ নং শেডের ঘটনায় আশিকুর রহমান রনিকে সহযোগিতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “সে আমার পরিচিত, তাই তাকে সহযোগিতা করেছিলাম।” যদিও কার্গো শাখার দায়িত্ব পালনকারী মাহিদুল কেন ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের দায়িত্বশীল রনিকে ৩৭ নম্বর শেডের কাজে সহায়তা করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, এটি কেবল একটি চালান গায়েবের ঘটনা নয়, বরং বন্দরের ভেতরে গড়ে ওঠা অসাধু চক্রের দাপটের প্রতিফলন। এর আগেও ‘হুদা ইন্টারন্যাশনাল’ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য মাহিদুলের সহায়তায় ছাড় পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এহেন অনিয়ম ও দায়হীনতার কারণে একদিকে যেমন সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ছন্দপতন। সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় গত অর্থবছরে বেনাপোল বন্দরে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।

সর্বাধিক পঠিত

বেনাপোল বন্দরে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য গায়েব: মূলহোতা মাহিদুলসহ সিন্ডিকেট অধরা

বেনাপোল বন্দরে ৬ কোটি টাকার জব্দ পণ্য গায়েব: মূলহোতা মাহিদুলসহ সিন্ডিকেট অধরা

আপডেট: ০৬:৩০:১৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা ঘটেছে। বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ৬ কোটি টাকা মূল্যের জব্দকৃত উচ্চ শুল্কযুক্ত ভারতীয় পণ্য রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে গেছে। মূল্যবান পণ্যের পরিবর্তে সেখানে রাখা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের দেশীয় শাড়ি ও থ্রিপিস। এই গুরুতর অনিয়মের ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করলেও, মূল অভিযুক্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মাহিদুল ইসলামকে রাখা হয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে গত ১২ মার্চ বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে একটি পণ্য চালান জব্দ করা হয়। চালানটি যেন কোনোভাবেই হাতবদল না হয়, সেজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১২ মার্চ, ২ এপ্রিল এবং ২০ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে তিনটি আলাদা চিঠিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানায়। কিন্তু কোরবানির ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে বন্দরের তালাবদ্ধ শেড থেকে জব্দকৃত পণ্য সরিয়ে ফেলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে ২ জুন কায়িক পরীক্ষায় পণ্য পরিবর্তনের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর গত ৯ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে ১০ জনের নামে মামলা দায়ের করে (মামলা নং-০৯, কাস্টমস আইন ২০২৩)। অথচ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল কারিগর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামকে মামলার আসামি করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বন্দর এলাকায় গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ শুল্ক ফাঁকি সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন এই মাহিদুল। তার সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেন প্রধানমন্ত্রীর বন্ধু পরিচয়দানকারী বগুড়ার হিরু, অস্ত্র ব্যবসায়ী আজিম, সামাদ, ডাব্লু, রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ার এবং মনির। এছাড়া, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাইনুল ইসলাম-১ ও বন্দরের আশিকুর রহমান রনি যোগসাজশে ওজনে কারচুপি ও জাল নথিপত্র তৈরি করে পণ্য খালাসে সক্রিয় রয়েছেন। রিয়াদ এজেন্সির কর্মচারী রুহুল কুদ্দুস ওরফে আনোয়ারের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে এ রফাদফা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বেনাপোল বন্দরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি শেড ইনচার্জ, ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে মামলা হয়, তবে কাস্টমস কর্মকর্তা মাহিদুল কেন মামলার বাইরে থাকবে? স্থানীয়দের অভিযোগ, কাস্টমস কমিশনারের গোপন আঁতাত ও প্রশ্রয় ছাড়া বন্দরে এমন ভয়াবহ অপরাধ চালানো অসম্ভব। এ ধরণের অবৈধ লেনদেনের টাকা ঢাকায় কমিশনারের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পৌঁছানো হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। তবে ৩৭ নং শেডের ঘটনায় আশিকুর রহমান রনিকে সহযোগিতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, “সে আমার পরিচিত, তাই তাকে সহযোগিতা করেছিলাম।” যদিও কার্গো শাখার দায়িত্ব পালনকারী মাহিদুল কেন ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ডের দায়িত্বশীল রনিকে ৩৭ নম্বর শেডের কাজে সহায়তা করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, এটি কেবল একটি চালান গায়েবের ঘটনা নয়, বরং বন্দরের ভেতরে গড়ে ওঠা অসাধু চক্রের দাপটের প্রতিফলন। এর আগেও ‘হুদা ইন্টারন্যাশনাল’ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণায় আনা পণ্য মাহিদুলের সহায়তায় ছাড় পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এহেন অনিয়ম ও দায়হীনতার কারণে একদিকে যেমন সরকারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ছন্দপতন। সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় গত অর্থবছরে বেনাপোল বন্দরে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।