১২:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬

বিদ্রোহ ও সাম্যের কবিকে স্মরণ: ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে দেশজুড়ে নজরুল বন্দনা

বাংলা সাহিত্য, সংগীত, বিদ্রোহ ও সাম্যের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। প্রেম, মানবতা ও সম্প্রীতির এই মহান কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা এবং স্মরণানুষ্ঠান।

জাতীয় পর্যায়ে এবার জন্মজয়ন্তীর মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং নজরুলসংগীতের বিশেষ আসর।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। নজরুল চর্চা ও তার সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলকে নতুনভাবে পাঠ ও অনুধাবনের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রের মতো উচ্চারণ করেছে বিদ্রোহের ভাষা, সেই কলমই আবার লিখেছে প্রেম, সাম্য ও মানবতার গান। নজরুল শুধু একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন।

‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই’—এই দর্শনই ছিল তার সাহিত্য ও জীবনের মূল শক্তি। নিজের সন্তানদের নামেও তিনি বহন করেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা। তার রচনায় যেমন উঠে এসেছে কোরআনের বাণী, তেমনি স্থান পেয়েছে শ্যামা, কালী ও কৃষ্ণভক্তির গানও। ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক ঐক্যের এমন শক্তিশালী প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে বিরল।

নজরুলের কবিতা, গান ও প্রবন্ধে উঠে এসেছে সমাজের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের কথা। নারীর অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং শোষণের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন দিক ও শক্তি।

মাত্র ৪৩ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি রচনা করেছেন দুই হাজারেরও বেশি গান এবং অসংখ্য কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ। ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘দোলনচাঁপা’র মতো সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই মৃত্যুর পরও মানুষের কাছেই থাকতে চেয়েছিলেন জাতীয় কবি। সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে তার সমাধিস্থল নির্বাচনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। প্রতিদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপ বলেন, “এত অল্প সময়ে এতগুলো জায়গায় কীভাবে বিচরণ করেছেন, তা আমার কাছে এক রহস্যের মতো মনে হয়।”

অন্যদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এখন বিশ্বব্যাপী নজরুলকে ছড়িয়ে দেওয়া। নজরুল সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হলে তিনি আরও বেশি বিশ্বজনীন হয়ে উঠবেন।”

সাহিত্যিক পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে নজরুল ছিলেন মানবতা, সাম্য ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। তাই তাকে শুধু জন্মদিনে স্মরণ করলেই হবে না—তার আদর্শ, চিন্তা ও মানবিক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নজরুল চর্চাকে আরও বিস্তৃত করাই হতে পারে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

সর্বাধিক পঠিত

বেনাপোলে শ্রমিক নেতা মিজুনের কবর জিয়ারত, পরিবারের পাশে যুবদল নেতা শহীদ

বিদ্রোহ ও সাম্যের কবিকে স্মরণ: ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে দেশজুড়ে নজরুল বন্দনা

আপডেট: ১২:২১:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

বাংলা সাহিত্য, সংগীত, বিদ্রোহ ও সাম্যের প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। প্রেম, মানবতা ও সম্প্রীতির এই মহান কবিকে স্মরণ করতে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশনা এবং স্মরণানুষ্ঠান।

জাতীয় পর্যায়ে এবার জন্মজয়ন্তীর মূল আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নজরুল একাডেমি প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং নজরুলসংগীতের বিশেষ আসর।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারিভাবেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। নজরুল চর্চা ও তার সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নজরুলকে নতুনভাবে পাঠ ও অনুধাবনের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।

যে কলম অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রের মতো উচ্চারণ করেছে বিদ্রোহের ভাষা, সেই কলমই আবার লিখেছে প্রেম, সাম্য ও মানবতার গান। নজরুল শুধু একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ধর্মীয় বিভাজন ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন।

‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই’—এই দর্শনই ছিল তার সাহিত্য ও জীবনের মূল শক্তি। নিজের সন্তানদের নামেও তিনি বহন করেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা। তার রচনায় যেমন উঠে এসেছে কোরআনের বাণী, তেমনি স্থান পেয়েছে শ্যামা, কালী ও কৃষ্ণভক্তির গানও। ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক ঐক্যের এমন শক্তিশালী প্রকাশ বাংলা সাহিত্যে বিরল।

নজরুলের কবিতা, গান ও প্রবন্ধে উঠে এসেছে সমাজের বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের কথা। নারীর অধিকার, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম এবং শোষণের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে নতুন দিক ও শক্তি।

মাত্র ৪৩ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি রচনা করেছেন দুই হাজারেরও বেশি গান এবং অসংখ্য কবিতা, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ। ‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘দোলনচাঁপা’র মতো সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই মৃত্যুর পরও মানুষের কাছেই থাকতে চেয়েছিলেন জাতীয় কবি। সেই ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে তার সমাধিস্থল নির্বাচনেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। প্রতিদিন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিবেদন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারম্যান প্রিয়াংকা গোপ বলেন, “এত অল্প সময়ে এতগুলো জায়গায় কীভাবে বিচরণ করেছেন, তা আমার কাছে এক রহস্যের মতো মনে হয়।”

অন্যদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এখন বিশ্বব্যাপী নজরুলকে ছড়িয়ে দেওয়া। নজরুল সাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হলে তিনি আরও বেশি বিশ্বজনীন হয়ে উঠবেন।”

সাহিত্যিক পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে নজরুল ছিলেন মানবতা, সাম্য ও সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতীক। তাই তাকে শুধু জন্মদিনে স্মরণ করলেই হবে না—তার আদর্শ, চিন্তা ও মানবিক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং নজরুল চর্চাকে আরও বিস্তৃত করাই হতে পারে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।