পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস–এর অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওপার বাংলার প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা–এর এক বিশ্লেষণে দলের সম্ভাব্য দুর্বলতার পেছনে আটটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
একটানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনমনে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সিন্ডিকেট প্রভাব, জনপ্রতিনিধিদের বিত্তবৃদ্ধি এবং সরকারি সুবিধা বণ্টনে বৈষম্য—এসব অভিযোগে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ২০২১ সালের পরও সেই ক্ষোভ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
চিটফান্ড, নারদ কাণ্ড থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ, রেশন ও কয়লা পাচার—বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলকে ঘিরে রেখেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়–এর ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে বিপুল অর্থ উদ্ধারের ঘটনা দলীয় ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়। একের পর এক নেতা গ্রেপ্তার হওয়ায় জনআস্থায় ফাটল ধরেছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়ায় বহু ভুয়া বা অকার্যকর নাম বাদ পড়ে যায়। এতে করে তথাকথিত ‘ম্যানেজড ভোট’-এর সুযোগ কমে যায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের একটি অংশের নাম বাদ পড়ায় তৃণমূলের ভিত কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এই ইস্যুকে সামনে এনে সংখ্যাগুরু ভোটকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক ঘটনার পর যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগও প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক রদবদলের ফলে রাজ্য প্রশাসনের উপর তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ কমেছে বলে ধারণা। এমনকি প্রচারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া উপস্থিতি এবং নজরদারিতে নির্বাচনী সহিংসতা অনেকটাই কমে যায়। ফলে ভোটাররা তুলনামূলক স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন, যা তৃণমূলের প্রচলিত নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলেছে।
কম দফায় হলেও নির্বাচন ছিল শান্তিপূর্ণ এবং রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন। ছাপ্পা ভোট, বুথ দখল বা ভয়ভীতি—এসবের অনুপস্থিতি বিরোধীদের ভোট বাড়াতে সহায়তা করেছে।
তৃণমূলের কৌশলগত মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত আই-প্যাক (I-PAC) হঠাৎ কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় দল সাংগঠনিকভাবে ধাক্কা খায়। প্রায় ৪১ হাজার কর্মী নিয়ে গড়ে ওঠা এই পরামর্শক সংস্থার কার্যক্রম থেমে যাওয়ায় প্রচার ও কৌশল নির্ধারণে প্রভাব পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আটটি কারণ মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে একটি জটিল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যদিও অতীতে একাধিক বিতর্ক সত্ত্বেও দলটি ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।




















