যশোরের কৃতি সন্তান, ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিমল রায় চৌধুরীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। সাতটি বছর পেরিয়ে গেলেও, তিনি এখনও এলাকার মানুষের হৃদয়ে অম্লান। বিমল রায় চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার যশোর সদরের নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বিরামপুর সৎসঙ্গ মন্দিরে এক বিশেষ প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত সকলে তাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেন। প্রার্থনা শেষে সকলের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। এই অনুষ্ঠানে প্রয়াত বিমল রায় চৌধুরীর পুত্র অনুপ রায় চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন এবং তার বাবার স্মৃতিচারণ করেন।
বিমল রায় চৌধুরী ছিলেন একজন নিভৃতচারী দেশপ্রেমিক। সমাজ সংস্কার ও দেশের উন্নয়নে তার অবদান ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। নিজ এলাকা বিরামপুরসহ যশোর অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে তিনি আমৃত্যু নিবেদিত ছিলেন। ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর, ৯৪ বছর বয়সে, যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিমল রায় চৌধুরী ১৯২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি যশোর সদরের বিরামপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সুরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ছিলেন সমাজ সংস্কারক এবং মা অনিলা রায় চৌধুরী ছিলেন একজন প্রগতিশীল নারী, যিনি গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে কাজ করতেন। পিতা-মাতার অনুপ্রেরণায় তিনি শৈশব থেকেই সমাজসচেতন ও প্রতিবাদী মানসিকতায় বেড়ে ওঠেন। তিনি যশোর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। স্কুলজীবনে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৩৬ সালে ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। যশোর এমএম কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কৃষক ও মৎস্যজীবী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং ১৯৪৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করে এক মাস কারাগারে থাকতে হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯৫৪ সালে তাকে আবারও কারাবরণ করতে হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি একজন সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, এবং ভারতে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন।
তিনি ১৯৬৪ সালে নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। তার উদ্যোগে যশোরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ আরও অনেক সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়। তিনি যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার আজীবন সদস্য এবং তিনবার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এছাড়া, তিনি জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং সৎসঙ্গ বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
বিমল রায় চৌধুরী তার পৈত্রিক জমিতে স্ত্রীর নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিরামপুর এলাকায় অসংখ্য দরিদ্র পরিবারকে জমি দান করেন। তার অবদান আজও যশোরবাসীর হৃদয়ে অম্লান থাকবে।





















