চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কেডিকে ইউনিয়নে সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ভুয়া সার কার্ড ও বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে খুচরা সার বিক্রেতাদের অনুকূলে সার বরাদ্দ এবং বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় কৃষক ও একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা প্রকৃত চাষিদের মধ্যে বিতরণের পরিবর্তে একটি অংশ ভুয়া কার্ড ও বিশেষ স্লিপ ব্যবহার করে খুচরা সার বিক্রেতাদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, কেডিকে ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামান। একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অতীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি শুকুর সরকার এবং সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল বাসার শিপলুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব সম্পর্কের সঙ্গে কথিত অনিয়মের যোগসূত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, কেডিকে ইউনিয়নের প্রায় ২০টি খুচরা সার দোকানের অনুকূলে নামে-বেনামে একাধিক ভুয়া সার কার্ড তৈরি করা হয়েছিল। এসব কার্ড এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের স্বাক্ষর করা বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে দোকানগুলোতে সার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ করা সারের বিপরীতে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। সরকারি কৃষি প্রণোদনা বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রকৃত চাষিরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
তবে কতটি কার্ড জাল করা হয়েছে, কী পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কেডিকে ইউনিয়নের কৃষক ইনামুল, ইসরাইল, ইব্রাহিম ও খলিল অভিযোগ করেন, সার ও কৃষি বিষয়ে পরামর্শ নিতে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কার্যালয়ে পাওয়া যায় না। অথচ খুচরা সার বিক্রেতাদের ভুয়া কার্ড ও বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ বস্তা পর্যন্ত সার দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
কৃষকদের মতে, সরকারি সার বিতরণে প্রকৃত চাষিদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সহায়তা যদি অনিয়মের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যায়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর সরকারি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তদন্তের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। তবে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, তদন্ত যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সার বরাদ্দের নথি, কার্ড ও বিশেষ স্লিপের ব্যবহার, দোকানভিত্তিক বিতরণ তালিকা এবং কৃষি প্রণোদনার উপকারভোগীদের তথ্য যাচাই করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হবে।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল ইসলামের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও এলাকার সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। তাই এসব সুবিধা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ভুয়া কার্ড ও বিশেষ স্লিপ ব্যবহারের অভিযোগ কতটা সত্য, সার বরাদ্দে কোনো আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না—তা তদন্তের ফলেই স্পষ্ট হবে।





















