পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে টানা তিন দিনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ৭১ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। নিহতদের ভারত ও আফগানিস্তানের ‘মদতপুষ্ট’ সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পাকিস্তান।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এসব তথ্য জানিয়েছে। তবে ভারত ও আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের এই অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আফগানিস্তান দাবি করেছে, পাকিস্তান থেকে কথিত দায়েশ সদস্যরা সীমান্ত পেরিয়ে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় নুরিস্তান প্রদেশে প্রবেশ করার পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। আফগান বাহিনীর অভিযানে ২৮ জন নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কাবুল।
তবে আফগানিস্তানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এটিকে ‘হাস্যকর, ভিত্তিহীন ও সম্পূর্ণ অসত্য’ বলে মন্তব্য করেছে।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নুরিস্তান কিংবা আফগানিস্তানের অন্য কোনো এলাকায় অভ্যন্তরীণ সংঘাতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তারা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
সাবেক আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ বা প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আফগানিস্তানে সক্রিয় দায়েশ বা অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সহায়তার অভিযোগও পাকিস্তান অস্বীকার করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার পেছনে ভারত ও আফগানিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান। তবে ভারত ও আফগানিস্তান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
টিটিপি কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে টিটিপি সদস্যরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে।
তবে কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আফগান তালেবান সরকারের দাবি, আফগান ভূখণ্ড থেকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর এবং তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলার বড় একটি অংশ টিটিপি চালিয়েছে বলে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি।
চলতি মাসের শুরুতে খাইবার পাখতুনখাওয়ার কোহাটে একটি পুলিশ সদর দপ্তরে বিস্ফোরণ ও বন্দুক হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ১৬ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার আফগানিস্তান থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি ড্রোন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার পর আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানায় পাকিস্তান।
ইসলামাবাদ এসব হামলাকে ‘পরিকল্পিত, নির্ভুল, পরিমিত ও আনুপাতিক’ বলে বর্ণনা করেছে। পাকিস্তানের দাবি, হামলাগুলো কেবল শনাক্ত করা সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল এবং এসব স্থাপনা ড্রোন হামলার প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।
তবে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে এসব হামলার বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য ও আপত্তি রয়েছে।
পাকিস্তান আফগান তালেবান সরকারের প্রতি তাদের বিরুদ্ধে ‘বৈরী তৎপরতা’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ‘কার্যকর, সুনির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
অন্যদিকে কাবুল পাকিস্তানের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ফলে সীমান্তপারের সন্ত্রাসী তৎপরতা, পাল্টাপাল্টি হামলা ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক অভিযানে নিহত ৭১ জনের পরিচয়, তাদের সঙ্গে কোন সংগঠনের সম্পর্ক ছিল এবং ভারত বা আফগানিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহায়তার প্রমাণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।




















