দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে পড়ে থাকা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর অচলবস্থাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ শুরু হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান চরম উত্তেজনার ফলে সার্কের শীর্ষ সম্মেলনগুলো বারবার বাতিল হওয়ায় যে আঞ্চলিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে চীন ও পাকিস্তান একটি বিকল্প জোট গঠনের তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রস্তাবিত এই জোটে ভারতের কোনো উপস্থিতি থাকবে না, বরং চীনের প্রভাববলয়কে কেন্দ্র করে এই মেরুকরণ গড়ে তোলার ছক কষা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল লক্ষ্য হলো তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিপত্য বিস্তার করা। বাংলাদেশে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারে সাবমেরিন বেসের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমারে কিয়াউকপিউ বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করছে বেইজিং। অন্যদিকে, পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ‘চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর’ (সিপিইসি)-কে ভিত্তি করে তারা ভারতকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে। এই ত্রিমুখী সমীকরণে ভৌগোলিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশকে নিজেদের বলয়ে টানতে চায় চীন-পাকিস্তান অক্ষ।
‘উদ্ভট জোটের প্রস্তাব’: অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ
এই সম্ভাব্য নতুন জোটের বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি একে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে বলেন:
> “বাংলাদেশ এমন আঞ্চলিক জোটে কখনোই যাবে না। এখানে মিয়ানমারকেও রাখার কথা বলা হচ্ছে, যাদের সাথে আমাদের রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারকে নিয়ে কোনো জোট গঠন কার্যত অসম্ভব।”
নির্বাচনের আগে এই জোটের আলোচনা ভারতকে কোনো বিশেষ বার্তা দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ৫ আগস্ট পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অস্বস্তি এখন প্রকাশ্য। বিদায়ী ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্বীকার করেছেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলেনি। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। এই স্থবিরতা নির্বাচিত সরকার এলে কাটতে পারে।”
তবে সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো ভিন্ন কথা বলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মাঝে এক ধরনের ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান কাজ করছে, যার ফলে তারা ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। উল্টো চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে সরকারের অতি-তৎপরতা দিল্লির নজরে এসেছে।
রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের বাইরে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ উল্লেখ করেন, এই সরকারের আমলে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। তিনি মনে করেন, পাকিস্তান অনেক দূরের দেশ হওয়ায় তাদের সঙ্গে চাইলেই বিশাল বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়া সম্ভব নয়। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ভারতের সাথে অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানো কঠিন।
দক্ষিণ এশিয়ার এই নতুন ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোন মেরুতে অবস্থান নেবে, তা আগামী দিনের নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে।





















