রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডে (এমপিএল) প্রশাসনিক অনিয়ম, পদোন্নতি ও বদলিতে স্বচ্ছতার ঘাটতি, তেল চুরি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এমআই) মো. রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে ভুয়া সনদে চাকরি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার, নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য, ডিপো থেকে অর্থ আদায়, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ নেওয়া এবং কোম্পানির গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাশেদুল হককে ঘিরে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে উঠেছে। ওই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিপো ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অনিয়ম এবং জ্বালানি তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাশেদুল হক ২০১২ সালের ১ নভেম্বর মেঘনা পেট্রোলিয়ামে যোগদান করেন। এরপর প্রায় ১৫ বছর ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
তাদের অভিযোগ, কোম্পানির প্রচলিত বদলি নীতিমালা অনুযায়ী একজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ সীমিত থাকার কথা। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় দায়িত্ব পালনের ফলে তার প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে এবং এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়ে কোম্পানির সংশ্লিষ্ট নীতিমালা এবং রাশেদুল হকের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ প্রশাসনিক অনুমোদন ছিল কি না, তা নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রাশেদুল হকের নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১২ সালে কোম্পানির সাধারণ শাখার সপ্তম গ্রেডের অফিসার পদের জন্য প্রথম বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রির পাশাপাশি তিন বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল।
তবে তিনি কারিগরি শাখার তুলনামূলক উচ্চ গ্রেডের বিএসসি পাস পদে ভুয়া সনদ ব্যবহার করে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা তার নিয়োগসংক্রান্ত নথি, শিক্ষাগত সনদ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড যাচাই করে বিষয়টির সত্যতা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর কোম্পানির পদোন্নতি নীতিমালার ১৪.১ ও ১৪.৩ ধারা লঙ্ঘন করে বিভাগীয় শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও চার কর্মকর্তাকে সরাসরি ম্যানেজার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন প্রশাসনের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে এসব পদোন্নতি দেওয়া হয়।
তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা কোম্পানির নথি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ডিপো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন ডিপো থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হতো। কোথাও কোথাও মাসে প্রায় কোটি টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ছাড়া মামলা পরিচালনার নামে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ নেওয়া এবং কোম্পানির গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ভাড়ায় ব্যবহার করে অর্থ উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব অনিয়মের অভিযোগের কথা জানিয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
রাশেদুল হকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো জ্বালানি তেল চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় মেঘনা পেট্রোলিয়ামের প্রধান স্থাপনা থেকে দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরি, অবৈধভাবে তেল পাচার এবং তেলের অপচয় হয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের উপমহাব্যবস্থাপক (পরিচালন) মুজিবুর রহমান চৌধুরী এবং তৎকালীন মেইন ইনস্টলেশনের ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী রাশেদুল হকের নামও অভিযোগে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় একটি চক্র এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানের মজুত, সরবরাহ, পরিবহন ও বিক্রয়সংক্রান্ত নথি এবং অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে রাশেদুল হক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করেন। এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, রাশেদুল হক অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নিজ এলাকা ভোলায় বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি এবং স্ত্রী-সন্তানদের নামে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র থাকার কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে।
এসব সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করতে সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দলিল পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না; এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রয়োজন।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের একটি অংশের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, ডিপো ব্যবস্থাপনা এবং তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক উপপরিচালক বলেন, কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে অথবা প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানের মতো উপাদান পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোনো সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে জাল সনদে নিয়োগ, নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ বা সম্পদের অসামঞ্জস্যের অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তার মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগের প্রভাব শুধু একজন কর্মকর্তা বা একটি বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি, বদলির আদেশ, ডিপো ও প্রধান স্থাপনার তেল মজুতের হিসাব, সরবরাহ ও বিক্রয় রেকর্ড, অডিট রিপোর্ট, বিল-ভাউচার, গাড়ি ব্যবহারের নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব।
তাই রাশেদুল হকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে একটি স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও আনুষ্ঠানিকভাবে নেওয়া এবং তদন্তে তার বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।




















