প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্পে (CTCRP) একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবিরের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগের মধ্যেই তিনি আগের মতোই দায়িত্ব পালন করায় প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। উপকূলীয় এলাকার ৩২টি পৌরসভায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও জলবায়ু সহিষ্ণুতা বাড়ানোই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। তবে প্রকল্পের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তব অগ্রগতি মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, সাজ্জাদ কবির দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের প্রভাব বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে উপ-প্রকল্প পরিচালক জুবাইদা আক্তার, মো. শাহজাহান ও উজ্জ্বল ত্রিপুরার নামও অভিযোগকারীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তাদের দাবি, নিয়োগ, কনসালট্যান্সি, ডিজাইন ও আর্থিক কার্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া পূর্বে নিয়োগ পাওয়া আউটসোর্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কনসালট্যান্টদের একাংশকে বাদ দিয়ে নতুন করে পছন্দের লোকজন নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে বা কীভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
প্রকল্পের আওতায় ৩২টি পৌরসভায় ৩৪টি আধুনিক মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আগের প্রকল্প পরিচালকের সময়ে নিয়োগ পাওয়া ডিজাইনারদের দায়িত্ব গ্রহণের পর বাদ দেওয়া হয়। পরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডিজাইনের কাজ করিয়ে সংশ্লিষ্ট খাতে অতিরিক্ত বিল দেখানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
ডিপিপিতে নির্ধারিত জনবল বা কাজের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হয়ে থাকলে তার অনুমোদন কোথা থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং ডিজাইনের মান কীভাবে যাচাই করা হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রকল্পের তিনটি কনসালট্যান্ট প্যাকেজ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্যাকেজে তিনজন বিদেশি টিম লিডারের পদ রাখা হলেও তারা বাংলাদেশে এসে প্রকল্পে কাজ না করেই বেতন বাবদ অর্থের বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট বিদেশি টিম লিডাররা প্রকল্পে কী পরিমাণ কাজ করেছেন, তাদের উপস্থিতির প্রমাণ এবং কর্মসম্পাদনের নথিপত্র কী—এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগটি সত্য হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নির্মাণকাজের মান নিয়েও অভিযোগ
সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন পৌরসভায় মার্কেট, সড়ক, ড্রেন ও শৌচাগার নির্মাণ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ, আবার কোথাও কাজের গুণগত মান ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এত বড় প্রকল্পে কাজের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, পরিমাপ, বিল যাচাই এবং কারিগরি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রক্রিয়ায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সামনে আসার পরও প্রকল্প পরিচালক সাজ্জাদ কবির দায়িত্বে বহাল থাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় এসেছে কি না এবং তদন্ত হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কতদূর।
বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, প্রকল্পের নিয়োগ, কনসালট্যান্ট প্যাকেজ, ডিজাইন, বিল-ভাউচার, নির্মাণকাজের মান এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আরও তথ্য ও নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়।




















