০১:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাই-টেক পার্কে অনিয়মের অভিযোগ, বদলির পরও শফিকের যোগদান নিয়ে প্রশ্ন

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:৩৭:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৮

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), অনাপত্তিপত্র (এনওসি), জমি ও স্পেস বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে আইসিটি বিভাগ তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।

এরই মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অফিস আদেশে আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এবং মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। আদেশ অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাদের।

তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার নতুন কর্মস্থলে যোগদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না। তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও শফিক যোগদান করেননি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বদলি আদেশ বাস্তবায়নে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না, কিংবা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো অনুমোদন নিয়েছেন কি না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শফিক উদ্দীন ভূঁইয়া একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ১২টি জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক, ওএসএস সেন্টারের দায়িত্ব, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং শাখার দায়িত্ব এবং তাঁর মূল প্রশাসনিক পদসহ বিভিন্ন দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন কর্মকর্তার হাতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব কীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কোনো অডিট বা প্রশাসনিক আপত্তি ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষের সময় থেকে শফিকের প্রশাসনিক প্রভাব বাড়তে থাকে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে সরকারি অডিটে আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁর মূল বেতন বাবদ মোট ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩১৪ টাকা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত উত্তোলনের বিষয়টি অডিটে ধরা পড়ে।

এই অর্থ পরবর্তী সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার নথিপত্র কী—তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা খরচ দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ব্যয়ের একটি অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শফিককে ঘিরে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ওএসএস ও এনওসি প্রদানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্যামসাংসহ বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ডিউটি-ফ্রি ইকুইপমেন্ট আমদানির অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন হয়েছে।

এই অর্থের লেনদেন আদৌ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কার মাধ্যমে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এনওসি ফাইলে কারা নোট ও অনুমোদন দিয়েছেন এবং আমদানির কাগজপত্রের সঙ্গে অনুমোদনের তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ১২টি আইটি পার্ক প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও নির্মাণকাজের টেন্ডার এবং পার্কগুলোর জমি ও স্পেস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সূত্রপাত তাঁর চাকরিজীবনের পূর্ববর্তী ভূমিকা ও পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থানকে কেন্দ্র করে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি একসময় ‘কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এ ছাড়া তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) রঞ্জিত কুমারের নেতৃত্বাধীন একটি নিয়োগ-সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা নাটোরের সিংড়ায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১০ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এসব নিয়োগে কয়েক লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।

আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন টেন্ডারের গোপন প্রাক্কলন বা টেন্ডার এস্টিমেট নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে আগেই সরবরাহ করা হতো। এ অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের নথি, ডিজিটাল রেকর্ড এবং যোগাযোগের তথ্য পর্যালোচনা করে বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠেছে।

সব অভিযোগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়টি।

হাই-টেক পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও শফিক যোগদান করেননি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আইসিটি বিভাগ যখন অভিযোগগুলো তদন্তে কমিটি গঠন করেছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ডিজিটাল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বদলি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ, সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ প্রয়োজন। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তিও নিশ্চিত হওয়া উচিত।

হাই-টেক পার্কের প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি, জমি ও স্পেস বরাদ্দ এবং আর্থিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনার পাশাপাশি অর্থের ‘মানি ট্রেইল’ ও সিদ্ধান্তের ‘ফাইল ট্রেইল’ অনুসরণ করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চলমান তদন্তে এসব অভিযোগের কতটা সত্যতা পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়।

সর্বাধিক পঠিত

পছন্দের কর্মকর্তাদের দিয়ে অডিট, অনুমোদন ছাড়াই দায়িত্ব বণ্টনের অভিযোগ মাশুক বিল্লাহর বিরুদ্ধে

হাই-টেক পার্কে অনিয়মের অভিযোগ, বদলির পরও শফিকের যোগদান নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট: ১১:৩৭:২২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগ-বাণিজ্য, প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, টেন্ডারের গোপন তথ্য পাচার, ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), অনাপত্তিপত্র (এনওসি), জমি ও স্পেস বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে আইসিটি বিভাগ তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে।

এরই মধ্যে গত ৬ সেপ্টেম্বর পৃথক অফিস আদেশে আনোয়ার হোসেনকে চট্টগ্রামের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে এবং মো. শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে যশোরের সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। আদেশ অনুযায়ী ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাদের।

তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার নতুন কর্মস্থলে যোগদান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না। তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও শফিক যোগদান করেননি।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বদলি আদেশ বাস্তবায়নে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না, কিংবা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো অনুমোদন নিয়েছেন কি না।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শফিক উদ্দীন ভূঁইয়া একই সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে ১২টি জেলায় আইটি/হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একান্ত সচিব, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক, ওএসএস সেন্টারের দায়িত্ব, টেকনিক্যাল ও প্ল্যানিং শাখার দায়িত্ব এবং তাঁর মূল প্রশাসনিক পদসহ বিভিন্ন দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন কর্মকর্তার হাতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব কীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এসব দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কোনো অডিট বা প্রশাসনিক আপত্তি ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকর্ণ কুমার ঘোষের সময় থেকে শফিকের প্রশাসনিক প্রভাব বাড়তে থাকে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

শফিক উদ্দীন ভূঁইয়াকে ঘিরে সরকারি অডিটে আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাঁর মূল বেতন বাবদ মোট ৬ লাখ ৯১ হাজার ৩১৪ টাকা অতিরিক্ত ও অনিয়মিত উত্তোলনের বিষয়টি অডিটে ধরা পড়ে।

এই অর্থ পরবর্তী সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ফেরত বা সমন্বয় করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার নথিপত্র কী—তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দপ্তরের ‘আপ্যায়ন ব্যয়’ হিসেবে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা খরচ দেখানোর বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ব্যয়ের একটি অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শফিককে ঘিরে অন্যতম গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ওএসএস ও এনওসি প্রদানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্যামসাংসহ বিভিন্ন বহুজাতিক ও স্থানীয় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ডিউটি-ফ্রি ইকুইপমেন্ট আমদানির অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার গোপন লেনদেন হয়েছে।

এই অর্থের লেনদেন আদৌ হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কার মাধ্যমে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট এনওসি ফাইলে কারা নোট ও অনুমোদন দিয়েছেন এবং আমদানির কাগজপত্রের সঙ্গে অনুমোদনের তথ্যের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া ১২টি আইটি পার্ক প্রকল্পের প্রশিক্ষণ ও নির্মাণকাজের টেন্ডার এবং পার্কগুলোর জমি ও স্পেস বরাদ্দকে কেন্দ্র করে কয়েক কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সূত্রপাত তাঁর চাকরিজীবনের পূর্ববর্তী ভূমিকা ও পরবর্তী প্রশাসনিক উত্থানকে কেন্দ্র করে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি একসময় ‘কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক’ হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এ ছাড়া তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) রঞ্জিত কুমারের নেতৃত্বাধীন একটি নিয়োগ-সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নিজ এলাকা নাটোরের সিংড়ায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার প্রকল্পে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অন্তত ১০ জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং এসব নিয়োগে কয়েক লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করে সত্যতা নির্ধারণ করা জরুরি।

আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন টেন্ডারের গোপন প্রাক্কলন বা টেন্ডার এস্টিমেট নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাছে আগেই সরবরাহ করা হতো। এ অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ফলে সংশ্লিষ্ট টেন্ডারের নথি, ডিজিটাল রেকর্ড এবং যোগাযোগের তথ্য পর্যালোচনা করে বিষয়টি তদন্তের দাবি উঠেছে।

সব অভিযোগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে শফিক উদ্দীন ভূঁইয়ার বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার বিষয়টি।

হাই-টেক পার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, শফিক দুই দিন ধরে প্রধান কার্যালয়ে ডিউটি করছেন না এবং তিনি শুনেছেন, বদলিকৃত কর্মস্থলেও শফিক যোগদান করেননি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আইসিটি বিভাগ যখন অভিযোগগুলো তদন্তে কমিটি গঠন করেছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ও ডিজিটাল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বদলি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি নয়। অভিযোগ সত্য হলে দায় নির্ধারণ, সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ প্রয়োজন। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তদন্তের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তিও নিশ্চিত হওয়া উচিত।

হাই-টেক পার্কের প্রকল্প, নিয়োগ, টেন্ডার, ওএসএস, এনওসি, জমি ও স্পেস বরাদ্দ এবং আর্থিক লেনদেনের নথি পর্যালোচনার পাশাপাশি অর্থের ‘মানি ট্রেইল’ ও সিদ্ধান্তের ‘ফাইল ট্রেইল’ অনুসরণ করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা ও দায়ীদের ভূমিকা স্পষ্ট হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, চলমান তদন্তে এসব অভিযোগের কতটা সত্যতা পাওয়া যায় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয়।