একটা সময় শৈশব মানেই ছিল মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর প্রাণখোলা হাসি। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখনকার শিশুদের বড় একটি অংশ দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোন, ট্যাব, টিভি কিংবা গেমিং ডিভাইসের স্ক্রিনে। আর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে তাদের চোখ, মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনিক সাড়ে চার ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের কারণে প্রতি তিনজন শিশুর মধ্যে দুজন চোখের নানা সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার শিকার হচ্ছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করা হয় ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে। এতে দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে শিশুদের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা স্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ থাকলেও অধিকাংশ শিশু তার দ্বিগুণেরও বেশি সময় কাটাচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইসে।
শুধু চোখের সমস্যাই নয়, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর অন্তত দুজন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা এবং আচরণগত সমস্যায় ভুগছে।
এ প্রসঙ্গে এক অভিভাবক জানান, “এক ঘণ্টা-দুই ঘণ্টা মোবাইল দেখতেই থাকে। মোবাইল রাখতে বললে শোনে না। দেখতে দেখতে চোখ লাল হয়ে যায়, ফুলে যায়, তারপরও মোবাইল ছাড়তে চায় না।”
আরেকজন মা বলেন, “মোবাইল, টিভি, ট্যাব, ল্যাপটপ— সবকিছুর প্রতিই আসক্ত বাচ্চারা। নিজেরাই ইউটিউব চালাতে পারে। কিভাবে পারে বুঝতেই পারি না।”
একজন অভিভাবক জানান, পরীক্ষার পর সন্তান মোবাইল চেয়ে নেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পরই সে মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথার অভিযোগ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে শিশুদের চোখে চাপ পড়ে, যার ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা, চোখ লাল হওয়া এবং মাথাব্যথার মতো সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার শিশুদের ঘুম, মনোযোগ ও সামাজিক আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ও মনোবিজ্ঞানীরা অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শিশুদের নির্দিষ্ট সময়ের বেশি ডিভাইস ব্যবহার করতে না দেওয়া, বাইরে খেলাধুলায় উৎসাহিত করা এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়, তবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বড় ধরনের শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।




















