০২:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

যশোরে গৃহায়নের উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে তোলপাড়

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:২৯:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
  • ৫১৪

যশোরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালিত দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। হাজারো মানুষের কান্না, আর্তনাদ, হা-হুতাশ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজপত্রের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এ অভিযানের বৈধতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, উচ্ছেদে কোনো বিধি-বিধান মানা হয়নি, জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়নি, এমনকি যশোর থেকে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটও নেয়া হয়নি।

গত ১০ ও ১১ মে যশোর উপশহর হাউজিং এস্টেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪ শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ একর সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উচ্ছেদের শিকার বহু পরিবার দাবি করেছে, বৈধ রেজিস্ট্রি দলিল, দায়মুক্তি সনদ, খাজনা-ট্যাক্সের কাগজপত্র থাকার পরও তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা হয়েছে।

এ ঘটনায় যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক ইসলাম সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “এই অভিযানকে একেবারে অবৈধ বলা যেতে পারে।” তিনি জানান, কোনো উচ্ছেদ অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তথা ডিসিকে অবহিত করতে হয়। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, পুলিশ ফোর্স চাওয়া এবং বিধি অনুযায়ী কমপক্ষে সাত দিন আগে দুটি নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “হাউজিং কর্তৃপক্ষ আমাকে না জানিয়েই বাইরে থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এনে অভিযান চালিয়েছে। এখন অনেকে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আমাদের কাছে আসছেন। যাদের কাগজপত্র বৈধ, তাদের অবশ্যই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে অনেকের বৈধ প্লটকে জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ দেখিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনেকেই অভিযোগ করেন, সব কাগজপত্র দেখানোর পরও হাউজিং কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। এতে বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বল মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় পড়া অন্তত ৫ জনের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন। এছাড়া ঢাকা সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও ও আদালতে মামলা করার ঘোষণাও দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগী রুমা খাতুন, বাবু, তামিম রহমান, তালেব, কামরুল ইসলাম, দুটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষসহ অন্তত ৫০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দাবি— তাদের সব কাগজপত্র হালনাগাদ ও বৈধ। তারপরও উচ্ছেদের পাঁয়তারা করা হয়েছে।

ওষুধ ব্যবসায়ী লাকী তনু জানান, গত ১১ মে সকালে হঠাৎ এস্কেভেটর দিয়ে তাদের ফার্মেসি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ওষুধ নষ্ট হয়েছে। একইভাবে আঞ্জুয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, তিনি শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মচারীর কাছ থেকে প্লট কিনেছিলেন এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দায়মুক্তি সনদও ছিল। কিন্তু কোনো কথা না শুনেই তার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।

দুই দিনব্যাপী অভিযানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তিনটি আঞ্চলিক কার্যালয়সহ শত শত স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উপশহর গাবতলা মোড়, খাজুরা স্ট্যান্ড সংলগ্ন শিশু হাসপাতালের পাশ, বি ব্লক, শেখহাটি, হাইকোর্ট মোড় পুকুরপাড়, বারান্দীপাড়া ব্রিজ এলাকা এবং বিভিন্ন ব্লকে অভিযান চালানো হয়। কোথাও দোকান, কোথাও বাড়ির দেয়াল-বারান্দা, আবার কোথাও নির্মাণাধীন ভবনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান দাবি করেছেন, “জেলা প্রশাসককে জানিয়েই সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বারবার নোটিশ ও মাইকিং করা হয়েছিল। আদালতের কোনো স্থগিতাদেশও কেউ দেখাতে পারেনি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় সরকারি সম্পদ উদ্ধারে এই অভিযান চালানো হয়েছে।”

এদিকে যশোরজুড়ে এ অভিযান নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— বৈধ কাগজপত্র থাকা মানুষদের কেন উচ্ছেদ করা হলো? আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির মাধ্যমে বছরের পর বছর দখলবাজি চললেও হঠাৎ করে উচ্ছেদ অভিযানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এখন জেলা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তাদের দাবি— বৈধ মালিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অবৈধ উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সর্বাধিক পঠিত

দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আবার যাত্রীবাহী বাস পদ্মায়, চালক-সহকারী উদ্ধার

যশোরে গৃহায়নের উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে তোলপাড়

আপডেট: ১০:২৯:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

যশোরে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালিত দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। হাজারো মানুষের কান্না, আর্তনাদ, হা-হুতাশ আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাগজপত্রের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এ অভিযানের বৈধতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, উচ্ছেদে কোনো বিধি-বিধান মানা হয়নি, জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়নি, এমনকি যশোর থেকে কোনো ম্যাজিস্ট্রেটও নেয়া হয়নি।

গত ১০ ও ১১ মে যশোর উপশহর হাউজিং এস্টেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪ শতাধিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৫ একর সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে উচ্ছেদের শিকার বহু পরিবার দাবি করেছে, বৈধ রেজিস্ট্রি দলিল, দায়মুক্তি সনদ, খাজনা-ট্যাক্সের কাগজপত্র থাকার পরও তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা হয়েছে।

এ ঘটনায় যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক ইসলাম সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, “এই অভিযানকে একেবারে অবৈধ বলা যেতে পারে।” তিনি জানান, কোনো উচ্ছেদ অভিযানের আগে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তথা ডিসিকে অবহিত করতে হয়। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, পুলিশ ফোর্স চাওয়া এবং বিধি অনুযায়ী কমপক্ষে সাত দিন আগে দুটি নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এসব নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “হাউজিং কর্তৃপক্ষ আমাকে না জানিয়েই বাইরে থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এনে অভিযান চালিয়েছে। এখন অনেকে বৈধ কাগজপত্র নিয়ে আমাদের কাছে আসছেন। যাদের কাগজপত্র বৈধ, তাদের অবশ্যই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।”

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে অনেকের বৈধ প্লটকে জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ দেখিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে অনেকেই অভিযোগ করেন, সব কাগজপত্র দেখানোর পরও হাউজিং কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। এতে বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বল মাথাগোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় পড়া অন্তত ৫ জনের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন। এছাড়া ঢাকা সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কার্যালয় ঘেরাও ও আদালতে মামলা করার ঘোষণাও দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগী রুমা খাতুন, বাবু, তামিম রহমান, তালেব, কামরুল ইসলাম, দুটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষসহ অন্তত ৫০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দাবি— তাদের সব কাগজপত্র হালনাগাদ ও বৈধ। তারপরও উচ্ছেদের পাঁয়তারা করা হয়েছে।

ওষুধ ব্যবসায়ী লাকী তনু জানান, গত ১১ মে সকালে হঠাৎ এস্কেভেটর দিয়ে তাদের ফার্মেসি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ওষুধ নষ্ট হয়েছে। একইভাবে আঞ্জুয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, তিনি শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মচারীর কাছ থেকে প্লট কিনেছিলেন এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দায়মুক্তি সনদও ছিল। কিন্তু কোনো কথা না শুনেই তার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।

দুই দিনব্যাপী অভিযানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তিনটি আঞ্চলিক কার্যালয়সহ শত শত স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। উপশহর গাবতলা মোড়, খাজুরা স্ট্যান্ড সংলগ্ন শিশু হাসপাতালের পাশ, বি ব্লক, শেখহাটি, হাইকোর্ট মোড় পুকুরপাড়, বারান্দীপাড়া ব্রিজ এলাকা এবং বিভিন্ন ব্লকে অভিযান চালানো হয়। কোথাও দোকান, কোথাও বাড়ির দেয়াল-বারান্দা, আবার কোথাও নির্মাণাধীন ভবনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

তবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের খুলনা বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়াউর রহমান দাবি করেছেন, “জেলা প্রশাসককে জানিয়েই সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বারবার নোটিশ ও মাইকিং করা হয়েছিল। আদালতের কোনো স্থগিতাদেশও কেউ দেখাতে পারেনি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় সরকারি সম্পদ উদ্ধারে এই অভিযান চালানো হয়েছে।”

এদিকে যশোরজুড়ে এ অভিযান নিয়ে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন— বৈধ কাগজপত্র থাকা মানুষদের কেন উচ্ছেদ করা হলো? আবার কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির মাধ্যমে বছরের পর বছর দখলবাজি চললেও হঠাৎ করে উচ্ছেদ অভিযানে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এখন জেলা প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তাদের দাবি— বৈধ মালিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং অবৈধ উচ্ছেদের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।