মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে সংঘবদ্ধ অনিয়ম ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) ও প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে সাসপেন্স ও বিভিন্ন ব্যয় হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ জমা পড়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাপস চন্দ্র পাল ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন হিসাব ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মতিউল হাসান, কয়েকজন পরিচালক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাংকের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর), ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার ক্রয়, আসবাবপত্র কেনাকাটা এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
নথি অনুযায়ী, তাপস চন্দ্র পাল দীর্ঘদিন ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও কার্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অবস্থান ব্যবহার করে তিনি আর্থিক হিসাব ও বিভিন্ন ব্যয়ের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং কারসাজি করেছেন।
চিকিৎসা ব্যয় ব্যাংকের হিসাবে দেখানোর অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাপস চন্দ্র পালের স্ত্রী দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই চিকিৎসার ব্যয়ের একটি অংশ ব্যাংকের সাসপেন্স হিসাব থেকে পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনার খরচও ব্যাংকের অর্থে বহন করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্ত্রীর চিকিৎসার সময় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার সিঙ্গাপুর সফর, থাকা ও খাওয়ার ব্যয়ও ব্যাংকের অর্থ থেকে পরিশোধের অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে ল্যাপটপ ও সফটওয়্যার কেনাকাটা, আসবাবপত্র সংগ্রহ এবং সিএসআর ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দরপত্র, অনুমোদন, প্রকৃত মূল্য ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ ব্যাংকের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি পাওনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
দ্রুত পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
জানা গেছে, তাপস চন্দ্র পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়ে ২০১৮ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি), ২০২১ সালে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসভিপি), ২০২২ সালে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (ইভিপি) এবং ২০২৪ সালে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট (এসইভিপি) হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান।
অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তার দ্রুত পদোন্নতি হয়েছে। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সিএ, এসিসিএ বা এফসিএর মতো পেশাগত সনদ না থাকার পরও ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
‘এক টাকাও নেওয়ার ক্ষমতা নেই’
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ডিএমডি ও সিএফও তাপস চন্দ্র পাল বলেন, এসব বিষয়ে জ্ঞানত কোনো প্রশ্ন এখন পর্যন্ত তার কাছে আসেনি।
তিনি বলেন, ‘এটা ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এক টাকা নেওয়ার আপনার-আমার, কারও ক্ষমতা নাই। ব্যাংক থেকে কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নাই।’
তাপস চন্দ্র পাল আরও বলেন, কোনো ধরনের নথি ও যথাযথ অনুমোদন ছাড়া ব্যাংকের অর্থ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও অনুমোদন রয়েছে বলেও তিনি জানান।
নিজের যোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিএফও হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব যোগ্যতা তার রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কী পেয়েছে বা পায়নি, সে বিষয়ে তার জানা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএফও তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে অভিযোগের জবাব চাওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের পাশাপাশি মার্কেন্টাইল ব্যাংকের আর্থিক সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন কীভাবে চলেছে এবং সংশ্লিষ্ট কোনো পরিদর্শক বা কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগে উল্লেখিত অর্থ আত্মসাৎ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তের ফলেই অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে।




















