১২:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাবনা গণপূর্তের রাশেদ কবীরকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৬

পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প, দরপত্র প্রক্রিয়া, কাজের বিল পরিশোধ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসিক এলাকা গ্রিন সিটির বিদ্যুৎ সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের পাশাপাশি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রূপপুর গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় সরকারি নির্ধারিত দরের তুলনায় বিপুল অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব অনিয়মের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে রাশেদ কবীরের দায় প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের ১০ তলা মূল ভবনের বেজমেন্টের পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতাল ভবনের মূল কাজ শেষ হওয়ার আগেই ‘গ্লাস টাওয়ার’ নির্মাণের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।

পাবনা গণপূর্তের টেন্ডার আইডি ১২১৭৬৫০-এর আওতায় হাসপাতালের ‘এ’ ব্লক সংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজের জন্য ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে কাজটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

উক্ত কাজটি এসএ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক দ্বীন ইসলাম গণমাধ্যমকে তাঁর লাইসেন্স অন্য একজনকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালের ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ নামে ছয়টি গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে টেন্ডার প্যাকেজ অনুমোদনে সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

রূপপুর গ্রিন সিটিতে ১৮৬ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়েও সিএজির নিরীক্ষায় বড় ধরনের আর্থিক অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব সরঞ্জামের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বিপরীতে এ বাবদ প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি দরের তুলনায় প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকদের মতে, দরপত্রে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দরপত্রের মোট মূল্য প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যে অতিরিক্ত মূল্য ধরা হয়।

সিএজি প্রতিবেদনে গ্রিন সিটির ৭ নম্বর ভবনের কয়েকটি সরঞ্জামের মূল্য নিয়ে উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বিপরীতে বিল করা হয় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারের সরকারি মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা হলেও বিল ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা। পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেলের সরকারি মূল্য ১০ লাখ টাকার কম হলেও এর জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা বিল করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুটি জেনারেটরের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই পাঁচ ধরনের সরঞ্জামের জন্য মোট প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল করা হলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ফলে শুধু ওই ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্যে কাজ নেওয়ার তথ্য

নথি পর্যালোচনায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অর্থের সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনে প্রায় ৯২ কোটি টাকার কাজ পায়। এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

সাজিন এন্টারপ্রাইজ চারটি ভবনে প্রায় ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাজ পায়, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

অন্যদিকে এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনে প্রায় ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কাজ পায়। এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থ ফেরত ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

সিএজি প্রতিবেদনে দরপত্র মূল্যায়ন, কাজের আদেশ, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত পরিশোধ করা প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় রয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি রাশেদ কবীরের

অভিযোগ ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগও জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত

পাবনা গণপূর্তের রাশেদ কবীরকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

পাবনা গণপূর্তের রাশেদ কবীরকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট: ১২:৪৪:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাবনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প, দরপত্র প্রক্রিয়া, কাজের বিল পরিশোধ এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসিক এলাকা গ্রিন সিটির বিদ্যুৎ সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগের পাশাপাশি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে রূপপুর গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনায় সরকারি নির্ধারিত দরের তুলনায় বিপুল অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। তবে এসব অনিয়মের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে রাশেদ কবীরের দায় প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের ১০ তলা মূল ভবনের বেজমেন্টের পিলার নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ব্রিকচিপস ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতাল ভবনের মূল কাজ শেষ হওয়ার আগেই ‘গ্লাস টাওয়ার’ নির্মাণের নামে প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে।

পাবনা গণপূর্তের টেন্ডার আইডি ১২১৭৬৫০-এর আওতায় হাসপাতালের ‘এ’ ব্লক সংলগ্ন খোলা ছাদে কাচের কাজের জন্য ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৫৫ টাকা ব্যয়ের তথ্য রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ পরিশোধ করা হলেও বাস্তবে কাজটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

উক্ত কাজটি এসএ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক দ্বীন ইসলাম গণমাধ্যমকে তাঁর লাইসেন্স অন্য একজনকে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালের ‘রিমেইনিং ওয়ার্কস’ নামে ছয়টি গ্রুপে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। একই সঙ্গে টেন্ডার প্যাকেজ অনুমোদনে সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

রূপপুর গ্রিন সিটিতে ১৮৬ কোটি টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্প গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনাকাটা নিয়েও সিএজির নিরীক্ষায় বড় ধরনের আর্থিক অসংগতির তথ্য উঠে এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব সরঞ্জামের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। বিপরীতে এ বাবদ প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি দরের তুলনায় প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকদের মতে, দরপত্রে কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র ও জেনারেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ফলে দরপত্রের মোট মূল্য প্রাক্কলনের কাছাকাছি থাকলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি পণ্যে অতিরিক্ত মূল্য ধরা হয়।

সিএজি প্রতিবেদনে গ্রিন সিটির ৭ নম্বর ভবনের কয়েকটি সরঞ্জামের মূল্য নিয়ে উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকা, বিপরীতে বিল করা হয় ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমারের সরকারি মূল্য প্রায় ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকা হলেও বিল করা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি মূল্য প্রায় ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা হলেও বিল ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা। পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেলের সরকারি মূল্য ১০ লাখ টাকার কম হলেও এর জন্য প্রায় ২ কোটি টাকা বিল করা হয়েছে।

এ ছাড়া দুটি জেনারেটরের সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, বিপরীতে বিল করা হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই পাঁচ ধরনের সরঞ্জামের জন্য মোট প্রায় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা বিল করা হলেও সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। ফলে শুধু ওই ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্যে কাজ নেওয়ার তথ্য

নথি পর্যালোচনায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া অর্থের সঙ্গে সরকারি নির্ধারিত মূল্যের বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড পাঁচটি ভবনে প্রায় ৯২ কোটি টাকার কাজ পায়। এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

সাজিন এন্টারপ্রাইজ চারটি ভবনে প্রায় ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকার কাজ পায়, যেখানে সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

অন্যদিকে এমএসসিএল-জিকেবিপিএল যৌথ উদ্যোগ দুটি ভবনে প্রায় ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকার কাজ পায়। এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থ ফেরত ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

সিএজি প্রতিবেদনে দরপত্র মূল্যায়ন, কাজের আদেশ, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত পরিশোধ করা প্রায় ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তদন্ত সিদ্ধান্ত বা আদালতের রায় রয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি রাশেদ কবীরের

অভিযোগ ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ কবীরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকল্পের নথিপত্র যাচাই এবং সরকারি অর্থের ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগও জরুরি।