জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের মে মাসে শুরু হওয়া আন্দোলনের পর এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ওই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে যাঁর নাম নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল, সেই উপ-কর কমিশনার নুরুল ইসলাম খান কেন অনুসন্ধানের তালিকায় নেই।
অভিযোগকারীদের দাবি, নুরুল ইসলাম খান দীর্ঘদিন ধরে কর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রাজস্ব কর্মকর্তা দাবি করেন, এনবিআর পুনর্গঠন করে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা আন্দোলনে নুরুল ইসলাম খান নেপথ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাদের অভিযোগ, আন্দোলনকে সক্রিয় রাখতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। এমনকি প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এই অর্থের উৎস, ব্যবহার কিংবা এর সঙ্গে নুরুল ইসলাম খানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি পদোন্নতি ও সুবিধাজনক কর্মস্থল নিশ্চিত করে ঢাকার বাইরে চলে যান।
বর্তমানে নুরুল ইসলাম খান কক্সবাজার কর অঞ্চলের কর সার্কেল-০৬-এর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার কার্যালয় কক্সবাজারের তারাবনিয়ারছড়ার খুরুশকুল রোডের এস কে টাওয়ারের ২০১ নম্বর কক্ষে অবস্থিত বলে জানা গেছে।
নুরুল ইসলাম খানের সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানীর আফতাবনগরে তার দুটি প্লট রয়েছে। এ ছাড়া সাত শতাংশ জমির ওপর নির্মিত একটি ছয়তলা বাড়িও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজধানী ও তার নিজ জেলা নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ থাকতে পারে। তবে এ সম্পদের পরিমাণের বিষয়ে কোনো সরকারি সম্পদ বিবরণী বা স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, জমির দলিল, ব্যাংক হিসাব ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নুরুল ইসলাম খানের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সময় প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।
তবে এসব রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কর প্রশাসনে দীর্ঘদিন সুবিধা ভোগ করেছেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নুরুল ইসলাম খানের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কামাল নামের এক ব্যক্তির সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কামাল দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার একটি প্লট মালিক সমিতির সঙ্গে যুক্ত এবং রাজনৈতিকভাবেও একটি পক্ষের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তবে কামালের রাজনৈতিক পরিচয়, সম্পদের পরিমাণ এবং নুরুল ইসলাম খানের সঙ্গে তার আর্থিক সম্পর্কের বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় কামালের একাধিক বহুতল ভবন রয়েছে এবং নুরুল ইসলাম খান কর-সংক্রান্ত কাজে তাকে সুবিধা দিয়েছেন। বিশেষ করে তার মালিকানাধীন সম্পত্তির কর নির্ধারণে অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে।
নুরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে সাংবাদিকের পক্ষ থেকে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ফোনে কথা বলার পর অপর প্রান্তের ব্যক্তি সাংবাদিককে দেখা করতে বলেন এবং একপর্যায়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকিমূলক বক্তব্য দেন।
পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ওই নম্বরে ‘কামাল’ নাম দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয় সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে বলেও প্রতিবেদকের দাবি।
তবে ওই ব্যক্তি সত্যিই কামাল কি না এবং তিনি নুরুল ইসলাম খানের পক্ষ হয়ে হুমকি দিয়েছেন কি না—তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এমন গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে কল রেকর্ড, মেসেজ, নম্বরের মালিকানা ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তদন্ত প্রয়োজন।
আন্দোলনের পর সরকার এনবিআরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সাময়িক বহিষ্কার, বাধ্যতামূলক অবসর এবং ব্যাপক বদলির ঘটনাও ঘটে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একই সময় যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন বা আন্দোলনের নেপথ্যে ভূমিকার অভিযোগ ছিল, তাদের সবার বিষয়ে একই ধরনের তদন্ত হয়েছে কি না।
তাদের দাবি, নুরুল ইসলাম খানের সম্পদের উৎস ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
নুরুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সম্পদ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, আন্দোলনে অর্থায়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তার আয় ও সম্পদ বিবরণী, কর নথি, জমি ও ভবনের মালিকানা, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার হওয়া সম্ভব।




















