০৫:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

অনিয়মে সংকটের মুখে পূবালী ব্যাংক:

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৪:৫৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
  • ৫০৮

দেশের অন্যতম প্রাচীন বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংক দীর্ঘদিনের পর্ষদ দ্বন্দ্ব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম, বিতর্কিত ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকির কারণে গভীর সংকটে পড়েছে। অনুসন্ধানে ব্যাংকটির একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও তদন্ত মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাংকটির সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির সময় ঘোষিত বাজারদরের তুলনায় প্রতি ডলারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। পরে সেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের হিসাবে না গিয়ে একটি নির্দিষ্ট গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার লঙ্ঘন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইসিএসডি) আংশিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি আমদানি এলসির ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করে তা মতিঝিল করপোরেট শাখার গ্রাহক রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। একই ধরনের অনিয়ম সিলেট শাখাসহ আরও কয়েকটি শাখায়ও পাওয়া গেছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ মিললেও মাত্র পাঁচটি এলসি বিশ্লেষণের পর অনুসন্ধান কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পড়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ঘোষিত দরের বাইরে অর্থ আদায় করে তৃতীয় পক্ষের হিসাবে জমা করা উচ্চঝুঁকির মানি লন্ডারিংয়ের শামিল হতে পারে। কারণ ওই অর্থের বৈধ উৎস বা করসংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য নথি উপস্থাপন করা হয়নি।

এদিকে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। দুদক ও বিএফআইইউর নথি অনুযায়ী, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের একটি অংশ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক অভিযোগ তদন্ত করছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন এবং ১৩টি প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত ঋণ প্রদান। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্বও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলীর পুনর্নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এমডি হতে ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলেও তার অভিজ্ঞতা ১৬ বছর। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন বিধান পূর্বপ্রযোজ্য নয় এবং বিষয়টি বিশেষ ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে।

অন্যদিকে, ২০০৮ সাল থেকে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে একই ক্ষমতাকেন্দ্রের আধিপত্য বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালতের রায়, শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও পর্ষদে কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায় করপোরেট সুশাসন আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পুনরাবৃত্ত অনিয়ম, তদন্তের ধীরগতি এবং জবাবদিহির অভাব পূবালী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

রাজধানীর বসুন্ধরা থেকে গ্রেফতার সাতক্ষীরা-১ আসনের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম

অনিয়মে সংকটের মুখে পূবালী ব্যাংক:

আপডেট: ০৪:৫৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

দেশের অন্যতম প্রাচীন বেসরকারি ব্যাংক পূবালী ব্যাংক দীর্ঘদিনের পর্ষদ দ্বন্দ্ব, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম, বিতর্কিত ঋণ বিতরণ এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকির কারণে গভীর সংকটে পড়েছে। অনুসন্ধানে ব্যাংকটির একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এলেও তদন্ত মাঝপথে থেমে যাওয়া এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাংকটির সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূবালী ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির সময় ঘোষিত বাজারদরের তুলনায় প্রতি ডলারে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে। পরে সেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যাংকের হিসাবে না গিয়ে একটি নির্দিষ্ট গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালার লঙ্ঘন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইসিএসডি) আংশিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি আমদানি এলসির ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায় করে তা মতিঝিল করপোরেট শাখার গ্রাহক রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। একই ধরনের অনিয়ম সিলেট শাখাসহ আরও কয়েকটি শাখায়ও পাওয়া গেছে।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রায় ৫০টি এলসিতে একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ মিললেও মাত্র পাঁচটি এলসি বিশ্লেষণের পর অনুসন্ধান কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পড়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, ঘোষিত দরের বাইরে অর্থ আদায় করে তৃতীয় পক্ষের হিসাবে জমা করা উচ্চঝুঁকির মানি লন্ডারিংয়ের শামিল হতে পারে। কারণ ওই অর্থের বৈধ উৎস বা করসংক্রান্ত গ্রহণযোগ্য নথি উপস্থাপন করা হয়নি।

এদিকে পূবালী ব্যাংকের ঋণ বিতরণ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। দুদক ও বিএফআইইউর নথি অনুযায়ী, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঋণের একটি অংশ অন্য ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক অভিযোগ তদন্ত করছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে অনিয়ম, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন এবং ১৩টি প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত ঋণ প্রদান। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়-দায়িত্বও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলীর পুনর্নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কারণ নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এমডি হতে ২০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলেও তার অভিজ্ঞতা ১৬ বছর। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন বিধান পূর্বপ্রযোজ্য নয় এবং বিষয়টি বিশেষ ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে।

অন্যদিকে, ২০০৮ সাল থেকে পূবালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘদিন ধরে একই ক্ষমতাকেন্দ্রের আধিপত্য বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালতের রায়, শেয়ারহোল্ডারদের আপত্তি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা সত্ত্বেও পর্ষদে কাঠামোগত পরিবর্তন না হওয়ায় করপোরেট সুশাসন আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, পুনরাবৃত্ত অনিয়ম, তদন্তের ধীরগতি এবং জবাবদিহির অভাব পূবালী ব্যাংকের প্রতি গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।