রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডে (ইডিসিএল) নিয়োগ, পদায়ন, টেন্ডারপ্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি প্রায় ৯০ জনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০ কোটি টাকার কথিত নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের নাম এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফুজ্জামান, ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা বরকত উল রইস। তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, স্বজনপ্রীতি, কর্মচারীদের হয়রানি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত তুষারের বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং তদন্তের ফলাফল জানা যায়নি।
ইডিসিএলে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৯০ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের জন্য নির্ধারিত বা সংশ্লিষ্ট কোটা ব্যবহারের নামে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রকৃত জুলাই যোদ্ধার সংখ্যা মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন হতে পারে। বাকি নিয়োগের একটি বড় অংশে ভুয়া পরিচয়পত্র, অযোগ্য প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব দাবি সত্য হলে তা শুধু নিয়োগবিধির লঙ্ঘন নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের মর্যাদার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ অর্থের লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এবং কথিত অনিয়মের পক্ষে কী ধরনের নথি বা আর্থিক প্রমাণ রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগে ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর নিকটাত্মীয় ছাব্বির আহমেদকে সহকারী প্রকৌশলী পদে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ছাব্বির আহমেদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়োগবিধি, যোগ্যতা যাচাই এবং প্রার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, পরীক্ষার ফলাফল, মেধাতালিকা ও নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক বা অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে নথিপত্র যাচাই করে নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
ইডিসিএলের নিয়োগ, পদায়ন ও টেন্ডারপ্রক্রিয়ায় একটি প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, শামীম আহমেদ ও বরকত উল রইস ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুজ্জামানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে প্রশাসনিক কার্যক্রমে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তাঁদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বোর্ড, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্দেশনা দিয়েছিলেন কি না, নাকি তাঁদের নাম ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের লিখিত অনুমোদন, বোর্ডের কার্যবিবরণী, টেন্ডারসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক যোগাযোগ যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
শামীম আহমেদের চাকরির অতীত নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৩ সালে সহকারী ক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অভিযোগে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি কী প্রক্রিয়ায় পুনরায় প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং ডেপুটি ম্যানেজার পদে দায়িত্ব পান, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির আদেশ, তদন্ত প্রতিবেদন, আপিল বা পুনর্বহালসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং পদায়নের অনুমোদন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে কী ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বহাল ছিল কি না এবং পুনর্বহাল বা পদোন্নতি বিধিসম্মতভাবে হয়েছিল কি না—এসব তথ্য নথিভিত্তিক যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে ক্ষমতার অপব্যবহার, চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে অনিয়ম এবং কর্মচারীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি রক্ষা, পদোন্নতি নিশ্চিত করা কিংবা বদলি ঠেকানোর আশ্বাস দিয়ে কোনো কোনো কর্মচারীর কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে শামীম আহমেদ ও বরকত উল রইসের নাম জড়ানো হয়েছে। প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা তুষারের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে ভুক্তভোগী কর্মচারীদের বক্তব্য, লিখিত অভিযোগ, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড, বার্তা বা যোগাযোগের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি সংগ্রহ করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
## মন্ত্রীর নির্দেশনা অমান্যের অভিযোগ
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে এসব অনিয়ম সম্পর্কে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বদলি বা অপসারণের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে মন্ত্রীর নির্দেশনার প্রকৃতি, তা লিখিত ছিল কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত চলছে কি না—এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার পরও যদি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর কারণ কী? প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হওয়া উচিত।
ইডিসিএল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর নিয়োগ, ওষুধ উৎপাদন, ক্রয় ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা অবিলম্বে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. সাম্প্রতিক প্রায় ৯০ জনের নিয়োগপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা ও পরিচয় যাচাই।
২. কথিত ৫০ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে আর্থিক নথি ও ব্যাংক লেনদেন পরীক্ষা।
৩. নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি ও টেন্ডারসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে দায়ীদের চিহ্নিত করা।
৪. সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ।
৫. তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে আইন ও চাকরিবিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
৬. তদন্তের ফলাফল প্রকাশ এবং ভবিষ্যতে নিয়োগ ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
## সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ
ইডিসিএলের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন এবং জনস্বার্থ জড়িত। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের নাম ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে, তা উদ্ঘাটন ও প্রতিকারের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করাও জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়।
এখন দেখার বিষয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইডিসিএল পরিচালনা পর্ষদ এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক নিষ্পত্তির মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।




















