জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) কর্মকর্তা পদায়নে লটারি আয়োজনের উদ্যোগ ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে পদভেদে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের নেপথ্যে সংস্থার পরিচালক ফকির মোঃ মুনওয়ার হোসেনের ভূমিকা রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, লটারির মাধ্যমে স্বচ্ছ পদায়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে পছন্দের কর্মকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত পদে বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, লটারিকে সামনে রেখে একটি প্রভাবশালী মহল বদলি-বাণিজ্যের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সংস্থার ভূমি ও সম্পত্তি শাখার বিভিন্ন ফাইল থেকেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে অভিযোগকারীরা জানান, জাগৃকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অনুমোদিত ১৭টি পদে একযোগে লটারি হওয়ার কথা থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদকে প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। কী কারণে এসব পদ লটারির আওতায় রাখা হয়নি, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের দাবি।
এ ছাড়া লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্তের আগে কর্মকর্তাদের মৌখিক পরীক্ষা বা ‘ভাইভা’ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। অভিযোগ রয়েছে, ওই মৌখিক পরীক্ষার সময় কর্মকর্তাদের পছন্দের কর্মস্থলের তালিকা নেওয়া হয়েছে। এতে লটারির নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তাঁদের দাবি, লটারিকে স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এর আড়ালে নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে ঢাকার কাঙ্ক্ষিত পদে পদায়নের সুযোগ তৈরি করা হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পদায়নের জন্য বিবেচনাধীন কয়েকজন কর্মকর্তার বর্তমান পদে চাকরির মেয়াদ এখনো নির্ধারিত তিন বছর পূর্ণ হয়নি। এ-সংক্রান্ত একটি পূর্ববর্তী অফিস আদেশও দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন না করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ প্রকৌশলী ১৭টি পদেই নিরপেক্ষ, উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় লটারি আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তাঁদের মতে, পদায়নের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ এবং সব কর্মকর্তার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে পদায়ন কমিটির সভাপতি ও সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) হাছিনা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কমিটির প্রধান হওয়া সত্ত্বেও প্রক্রিয়াটির অনেক বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত নন। পুরো বিষয়টি সংস্থার চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক ফকির মোঃ মুনওয়ার হোসেন বলেন, চেয়ারম্যান তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে থাকেন। মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের আগে দু-একজন কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও তিনি জানান।
ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে পারে।
জাগৃকের পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষের মধ্যে বদলি-বাণিজ্য ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ প্রকৌশলী ও কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি, পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পদায়নের মানদণ্ড প্রকাশ এবং অনুমোদিত ১৭টি পদে সমানভাবে লটারি প্রয়োগ করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।




















