০১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬

দেশভাগের পর প্রথমবার আসাম থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক নৌপথে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১০:৫৮:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ৫১২

ভারতভাগের পর প্রায় সাত দশক পর ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক নৌপথে সরাসরি পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। সোমবার আসামের ডিব্রুগড় জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে বার্জটির যাত্রা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাসহ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিধায়কেরা উপস্থিত ছিলেন।

নমরূপের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের (এপিসিএল) উৎপাদিত মিথানল নিয়ে বার্জটি ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। প্রথমে ব্রহ্মপুত্র নদের জাতীয় জলপথ-২ ব্যবহার করে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ইন্দো-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট অনুসরণ করে নারায়ণগঞ্জে যাবে। বগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

এই পরীক্ষামূলক নৌযাত্রার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ডিব্রুগড়ের নদীপথে দীর্ঘদিন পর আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা। তার ভাষ্য, আসামের নিজস্ব পণ্য এখন নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই নৌযাত্রা একটি সূচনা, ভবিষ্যতে এ পথে আরও পণ্য পরিবহন হবে।

ঐতিহাসিকভাবে ডিব্রুগড় ছিল পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছাত। পরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসামের চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহনও নিয়মিত হতো।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে নদীপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রেলপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে নৌবাণিজ্য আরও সংকুচিত হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্যবিষয়ক প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়মিত কার্গো পরিবহন শুরু হতে আরও কয়েক দশক সময় লাগে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবারও বাড়ছে। ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ বাংলাদেশ হয়ে ডিব্রুগড়ে যায়। ২০২৪ সালে বগিবিল প্যাসেঞ্জার ও কার্গো টার্মিনাল উদ্বোধন করা হয়।

ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

ভারত সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এর আওতায় জাতীয় জলপথ-২ উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কারখানা নির্মাণ এবং বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীপথে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ তুলনামূলক কম এবং মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপও কমানো সম্ভব। ফলে ভারত-বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক নৌযোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এ নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আবু সাঈদের বাড়িতে বিএনপি নেতা নুরুজ্জামান লিটন

দেশভাগের পর প্রথমবার আসাম থেকে ঢাকায় পণ্যবাহী জাহাজ আন্তর্জাতিক নৌপথে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা

আপডেট: ১০:৫৮:৩১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

ভারতভাগের পর প্রায় সাত দশক পর ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক নৌপথে সরাসরি পণ্য পরিবহন শুরু হয়েছে। সোমবার আসামের ডিব্রুগড় জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে বার্জটির যাত্রা উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাসহ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিধায়কেরা উপস্থিত ছিলেন।

নমরূপের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেডের (এপিসিএল) উৎপাদিত মিথানল নিয়ে বার্জটি ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। প্রথমে ব্রহ্মপুত্র নদের জাতীয় জলপথ-২ ব্যবহার করে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ইন্দো-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুট অনুসরণ করে নারায়ণগঞ্জে যাবে। বগিবিল থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত মোট দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।

এই পরীক্ষামূলক নৌযাত্রার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ডিব্রুগড়ের নদীপথে দীর্ঘদিন পর আবার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া ঐতিহাসিক ঘটনা। তার ভাষ্য, আসামের নিজস্ব পণ্য এখন নদীপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই নৌযাত্রা একটি সূচনা, ভবিষ্যতে এ পথে আরও পণ্য পরিবহন হবে।

ঐতিহাসিকভাবে ডিব্রুগড় ছিল পূর্ব ভারতের গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। ১৮৫৬ সালের মধ্যেই কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছাত। পরে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে আসামের চা, কাঠ ও যাত্রী পরিবহনও নিয়মিত হতো।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ অঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত নৌযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে নদীপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রেলপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে নৌবাণিজ্য আরও সংকুচিত হয়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্যবিষয়ক প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়মিত কার্গো পরিবহন শুরু হতে আরও কয়েক দশক সময় লাগে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবারও বাড়ছে। ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ বাংলাদেশ হয়ে ডিব্রুগড়ে যায়। ২০২৪ সালে বগিবিল প্যাসেঞ্জার ও কার্গো টার্মিনাল উদ্বোধন করা হয়।

ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে।

ভারত সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। এর আওতায় জাতীয় জলপথ-২ উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত কারখানা নির্মাণ এবং বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীপথে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি খরচ তুলনামূলক কম এবং মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকের চাপও কমানো সম্ভব। ফলে ভারত-বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক নৌযোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এ নৌপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।