মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়ে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দক্ষিণে লালমাই পাহাড়ের গভীর থেকে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিন তরুণকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতীমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অপ্রতীম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম ও ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র সন্তান। সে কোটবাড়ীর বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে গোপনে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে কোটবাড়ীর বাসা থেকে বের হয় অপ্রতীম। দীর্ঘ সময় পার হলেও বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজ শুরু করেন।
পরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। ছেলেকে খুঁজে পেতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সহযোগিতা চান তার মা নাহিদা বেগম।
রাত পেরিয়ে গেলেও অপ্রতীমের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরদিন দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে লালমাই পাহাড়ের গভীরে তার মরদেহ দেখতে পান জিলানী নামে এক কৃষক।
জিলানীর ভাষ্য, ওই স্থানে একটি মরদেহ পড়ে ছিল এবং শিয়াল সেটি টানাটানি করছিল। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ডিবি ও সিআইডির সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যান।
সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনাস্থল থেকে অপ্রতীমের মানিব্যাগ পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে থাকা আইফোনটি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রথমে তুহিনকে শনাক্ত করে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাকে আটক করা হয়। পরে তার বাসা থেকে অপ্রতীমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় অপ্রতীমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়। সেখানে তারা প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেছিল বলে জানা গেছে।
পরে গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে আনাস এবং সাড়ে ৭টার দিকে ফাহিমকে আটক করা হয়।
তিনজনের সঙ্গে অপ্রতীমের কী ধরনের সম্পর্ক ছিল এবং হত্যাকাণ্ডে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা কী—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম। তিনি অপ্রতীমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
উপাচার্য বলেন, অপ্রতীমকে খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই চেষ্টা করেছেন। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীও ঘটনাস্থলে যান। তিনি জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে তিন মাসের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অপ্রতীমের মৃত্যুর ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার নিজ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিক্ষার্থীরা এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। ১২ ঘণ্টার মধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শোক কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ নোটিশের মাধ্যমে জানাবে।
অপ্রতীমের ময়নাতদন্ত গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। আজ সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তার বাবার বাড়ি চাঁদপুরে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক নূর মোহাম্মদ রাজু।




















