০১:৪০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেলওয়ের বড় প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক হাজার কোটি টাকায়

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১২:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১০

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নসহ রেলের জমি ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনায় সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পের বিশেষ অডিটে ৩৪টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে কাজের পরিমাণ কমানো ও ইউনিট রেট বাড়ানোর মাধ্যমে ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, উচ্চ হারে চুক্তির কারণে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা পরিশোধের বিষয় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ড্রয়িং-ডিজাইন ও বিল অব কোয়ান্টিটি (BOQ) ছাড়া ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকার ক্ষতির বিষয়ও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক টিম লিডার নিয়োগের দরপত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রার্থীর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি থাকার কথা থাকলেও একটি প্রার্থীর সনদে ‘BSc in Agricultural Engineering’ উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান দরদাতার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য চিঠি দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

সিডিআরপি প্রকল্পের আর্থিক মূল্যায়নেও একটি কনসোর্টিয়ামের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক সম্মিলিত টার্নওভার ছিল ২২০ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কনসোর্টিয়ামের টার্নওভার ছিল ২০৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার।

একাধিক প্যাকেজ একসঙ্গে পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ের বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অন্য দরদাতাদের যোগ্যতার ঘাটতির কারণে নন-রেসপন্সিভ করা হলেও একই ধরনের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে যোগ্য বিবেচনা করা হলো—এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হলেও উচ্ছেদে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রেলের জমির সীমানা রক্ষা ও দখল প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক স্থাপনা কীভাবে রেলের জমিতে গড়ে উঠল এবং কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ কিংবা নিয়মিত আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব অবৈধ স্থাপনা টিকে আছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রেলের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, দরপত্র মূল্যায়নে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সর্বাধিক পঠিত

পাবনা গণপূর্তের রাশেদ কবীরকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ

রেলওয়ের বড় প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক হাজার কোটি টাকায়

আপডেট: ১২:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নসহ রেলের জমি ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব ঘটনায় সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পের বিশেষ অডিটে ৩৪টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে কাজের পরিমাণ কমানো ও ইউনিট রেট বাড়ানোর মাধ্যমে ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা, উচ্চ হারে চুক্তির কারণে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা পরিশোধের বিষয় উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ড্রয়িং-ডিজাইন ও বিল অব কোয়ান্টিটি (BOQ) ছাড়া ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকার ক্ষতির বিষয়ও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের আন্তর্জাতিক টিম লিডার নিয়োগের দরপত্রে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রার্থীর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি থাকার কথা থাকলেও একটি প্রার্থীর সনদে ‘BSc in Agricultural Engineering’ উল্লেখ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ অবস্থায় ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান দরদাতার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য চিঠি দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে দরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।

সিডিআরপি প্রকল্পের আর্থিক মূল্যায়নেও একটি কনসোর্টিয়ামের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বার্ষিক সম্মিলিত টার্নওভার ছিল ২২০ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কনসোর্টিয়ামের টার্নওভার ছিল ২০৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার।

একাধিক প্যাকেজ একসঙ্গে পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ের বিধান থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অন্য দরদাতাদের যোগ্যতার ঘাটতির কারণে নন-রেসপন্সিভ করা হলেও একই ধরনের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে যোগ্য বিবেচনা করা হলো—এমন প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হলেও উচ্ছেদে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রেলের জমির সীমানা রক্ষা ও দখল প্রতিরোধ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক স্থাপনা কীভাবে রেলের জমিতে গড়ে উঠল এবং কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ কিংবা নিয়মিত আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব অবৈধ স্থাপনা টিকে আছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রেলের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, দরপত্র মূল্যায়নে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।