০৯:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

বেনাপোল কাস্টমস গোডাউন থেকে কোটি টাকার পণ্য পাচারচেষ্টা: এআরওসহ গ্রেফতার ৩

  • সেন্ট্রাল ডেস্ক নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ০৮:৩২:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
  • ৫০৮

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি | 

যশোরের বেনাপোল কাস্টমস গোডাউন থেকে ভারতীয় জব্দকৃত পণ্য পাচারের সময় কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ (এআরও) তিনজনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত একটি কাভার্ডভ্যান জব্দ করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ।

সোমবার (২২ জুন) বিকেলে বেনাপোল সদর বিজিবি ক্যাম্প থেকে আটক ব্যক্তিদের বেনাপোল পোর্ট থানায় সোপর্দ করা হয়। এর আগে দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে বেনাপোল বাজার এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) শ্রী ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, কাভার্ডভ্যানের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমসের নিলাম প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ জব্দ পণ্য গোডাউনে মজুদ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ত্রাণসামগ্রীর চালানের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে কোটি টাকার কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্য বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় গোডাউন কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেনাপোলে অধিকাংশ শুল্ক ফাঁকি, পণ্য চুরি ও অনিয়মের ঘটনা গভীর রাতে সংঘটিত হয়। প্রতিবারই তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। তবে এসব অনিয়ম উদঘাটনে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বিজিবি।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন বলেন, “কাস্টমসে বড় ধরনের অনিয়ম বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়লে পরে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা প্রথমে শনাক্ত করে বিজিবি। নিয়মিত অভিযান না থাকলে বড় বড় চালান গন্তব্যে পৌঁছে যেত।”

যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি কাভার্ডভ্যানসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মালামালের হিসাব ও সিজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে আটক হওয়া কোটি কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য কাস্টমসের বিজিবি গোডাউনে জমা রাখা হয়। পরে নিলাম শাখার মাধ্যমে এসব পণ্যের যাচাই-বাছাই শেষে নিলাম হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নিলাম কার্যক্রম স্থবির রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ও তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আগেই ত্রাণসামগ্রীর চালানের সঙ্গে অন্যান্য পণ্য পাচারের আশঙ্কার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কাস্টমস গেট ডিভিশন ও গোডাউনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাবে কীভাবে পণ্যবোঝাই গাড়ি কাস্টমস এলাকা থেকে বেরিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

ঘটনার পরপরই বেনাপোল কাস্টমস হাউস দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তবে ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন, শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় তদন্তে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী রাজ্জাক হোসেন বলেন, “কাস্টমসে এর আগেও পণ্য উধাও, শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির নানা ঘটনা ঘটেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এসব অনিয়ম বন্ধ হবে না।”

বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দুইজন এআরও ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বারবার ঘটে যাওয়া এ ধরনের অপরাধ বন্ধে শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বাধিক পঠিত

যশোরে লজিং ছাত্রের প্রেম নিয়ে বিরোধ: বৃদ্ধকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম

বেনাপোল কাস্টমস গোডাউন থেকে কোটি টাকার পণ্য পাচারচেষ্টা: এআরওসহ গ্রেফতার ৩

আপডেট: ০৮:৩২:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি | 

যশোরের বেনাপোল কাস্টমস গোডাউন থেকে ভারতীয় জব্দকৃত পণ্য পাচারের সময় কাস্টমসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাসহ (এআরও) তিনজনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত একটি কাভার্ডভ্যান জব্দ করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস ও আমদানি নিষিদ্ধ ওষুধ।

সোমবার (২২ জুন) বিকেলে বেনাপোল সদর বিজিবি ক্যাম্প থেকে আটক ব্যক্তিদের বেনাপোল পোর্ট থানায় সোপর্দ করা হয়। এর আগে দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে বেনাপোল বাজার এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) শ্রী ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, কাভার্ডভ্যানের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসান।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমসের নিলাম প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ জব্দ পণ্য গোডাউনে মজুদ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ত্রাণসামগ্রীর চালানের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে কোটি টাকার কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্য বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনায় গোডাউন কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেনাপোলে অধিকাংশ শুল্ক ফাঁকি, পণ্য চুরি ও অনিয়মের ঘটনা গভীর রাতে সংঘটিত হয়। প্রতিবারই তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দেওয়া হলেও একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। তবে এসব অনিয়ম উদঘাটনে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে বিজিবি।

বেনাপোলের ব্যবসায়ী জসিম উদ্দীন বলেন, “কাস্টমসে বড় ধরনের অনিয়ম বা শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরা পড়লে পরে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা প্রথমে শনাক্ত করে বিজিবি। নিয়মিত অভিযান না থাকলে বড় বড় চালান গন্তব্যে পৌঁছে যেত।”

যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি কাভার্ডভ্যানসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মালামালের হিসাব ও সিজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে আটক হওয়া কোটি কোটি টাকার চোরাচালান পণ্য কাস্টমসের বিজিবি গোডাউনে জমা রাখা হয়। পরে নিলাম শাখার মাধ্যমে এসব পণ্যের যাচাই-বাছাই শেষে নিলাম হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নিলাম কার্যক্রম স্থবির রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ও তদারকির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে আগেই ত্রাণসামগ্রীর চালানের সঙ্গে অন্যান্য পণ্য পাচারের আশঙ্কার বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কাস্টমস গেট ডিভিশন ও গোডাউনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নজরদারির অভাবে কীভাবে পণ্যবোঝাই গাড়ি কাস্টমস এলাকা থেকে বেরিয়ে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠেছে।

ঘটনার পরপরই বেনাপোল কাস্টমস হাউস দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। তবে ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন, শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা বিভাগীয় তদন্তে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী রাজ্জাক হোসেন বলেন, “কাস্টমসে এর আগেও পণ্য উধাও, শুল্ক ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির নানা ঘটনা ঘটেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এসব অনিয়ম বন্ধ হবে না।”

বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে দুইজন এআরও ও তিনজন সিপাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের দাবি, বারবার ঘটে যাওয়া এ ধরনের অপরাধ বন্ধে শুধু আশ্বাস নয়, কার্যকর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।