নিজস্ব প্রতিবেদক
নারায়ণগঞ্জে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৮-এর একাধিক কর্মকর্তা ও ভবনমালিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে।
এদিকে রাজউক জোন-৮-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, অবৈধ সম্পদ অর্জন, যথাযথ অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ, চাকরির পরীক্ষায় স্বজনকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ায় রাজউকের অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাজউকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, জোন-৮-এ রাজিয়া সুলতানার প্রভাব ও কর্তৃত্ব নিয়ে সংস্থার ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। এসব বিষয়ে রাজিয়া সুলতানার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াশফি ডেভেলপার লিমিটেড, সুফিয়া কমপ্লেক্স, সেন্ট্রাল প্লাজা, আছিয়া ম্যানশন, টিপিএল টাওয়ার ও কেএমএস টাওয়ারসহ একাধিক ভবনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ভবনমালিকদের অভিযোগ, রাজউক জোন-৮ কার্যালয়ে প্রাথমিক ছাড়পত্র থেকে শুরু করে নকশা অনুমোদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, ভবন নির্মাণের বিধিমালা অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে। নিয়মিত তদারকি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
নয়তলার অনুমোদনে ১০ তলা সুফিয়া কমপ্লেক্স
নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ার ৬৯ নম্বর প্লটে অবস্থিত সুফিয়া কমপ্লেক্সের বিরুদ্ধে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ তলা।
একইভাবে সেন্ট্রাল প্লাজার বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনটির গাড়ি পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গায় গোডাউন তৈরি করে দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং ভবনের নির্ধারিত সেটব্যাক বা খালি জায়গা রাখার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পানির সংরক্ষণ, ট্রান্সফরমার, জেনারেটর ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ভবনগুলোর বাসিন্দা ও ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
টিপিএল ও কেএমএস টাওয়ার নিয়েও অভিযোগ
রাজউক জোন-৮-এর কার্যালয়ও টিপিএল টাওয়ারে অবস্থিত। ভবনটির বিরুদ্ধে নির্মাণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রাজউক একাধিকবার জরিমানা করলেও অনিয়ম সংশোধনে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
পাশের কেএমএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও ভবন নির্মাণে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভবনমালিক ও কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভবনমালিকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ
সেন্ট্রাল প্লাজার মালিক আলমগীরের সঙ্গে রাজউক জোন-৮-এর কয়েকজন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে ভবনমালিককে অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণকাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অনিয়মে আরও দুটি ভবন নির্মাণের অভিযোগও করেন তিনি। তবে ভবনগুলোর নাম ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাকরিতে যোগদানের পর বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন
রাজিয়া সুলতানা ২০১১ সালের ২৪ মার্চ রাজউকে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের কিছুদিন পর যথাযথ ছুটি ও সরকারি আদেশ (জিও) ছাড়াই তিনি বিদেশ ভ্রমণ করেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৭ মে তিনি যুক্তরাজ্যে যান। এ ভ্রমণের অনুমোদন, ছুটি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া মালয়েশিয়া, দুবাই, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর একাধিকবার ভ্রমণের তথ্য উল্লেখ করেছেন কয়েকটি সূত্র। দেশের বাইরে তাঁর ব্যবসায় বিনিয়োগ রয়েছে বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব বিনিয়োগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদ অর্জন ও পূর্বাচলের প্লট নিয়ে অভিযোগ
রাজিয়া সুলতানার নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি পূর্বাচলে বিশেষ ব্যবস্থায় একটি প্লট পেয়েছেন। পাশাপাশি দক্ষিণখানে হাজী ক্যাম্পের বিপরীতে তাঁর পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরিতে বরাদ্দ পাওয়ার কথা থাকা একটি প্লট কৌশলে নিজের নামে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
তবে এসব সম্পদ ও প্লট বরাদ্দের বিষয়ে দলিল, বরাদ্দপত্র, আয়কর নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা জরুরি।
বোনকে চাকরির পরীক্ষায় সুবিধা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ
রাজউকের প্রশাসন বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে নিজের বোনকে সংস্থাটির চাকরির পরীক্ষায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন রাজিয়া সুলতানা—এমন অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগে তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামানের নামও এসেছে। বর্তমানে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুহম্মদ কামরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি অনেক আগের, তাঁর ঠিক মনে নেই।
তবে এ ঘটনায় কোনো বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কিংবা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব প্রদান নিয়ে অসন্তোষ
রাজিয়া সুলতানার পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব পাওয়া নিয়েও রাজউকের অভ্যন্তরে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজউকে উপপরিচালক (প্রশাসন) পদে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে আটটি পদ পূরণ এবং তিনটি পদ শূন্য ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই শূন্য পদের বিপরীতে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ জোন-৮-এর পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি) পদে অনুমোদিত ১২টি পদই শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, এসব পদে দায়িত্ব প্রদানের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ জোন-৮-এর দায়িত্ব দেওয়া হলো?
তবে পদসংখ্যা, পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধিমালা এবং সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি পর্যালোচনা ছাড়া সিদ্ধান্তে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
অভিযোগের বিষয়ে পরিচালকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
নারায়ণগঞ্জে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং রাজউক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে রাজিয়া সুলতানার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে ক্ষুদে বার্তাও পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া তাঁর বিদেশ ভ্রমণ, সম্পদ অর্জন, চাকরির পরীক্ষায় স্বজনকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং পদোন্নতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নির্মাণকাজের নিয়মিত তদারকি এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এসব বিষয়ে অবহেলা জননিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ অবস্থায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।




















